মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরের ছয় মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর হাতে কমপক্ষে ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৫৩ জন শিশু এবং ২২৪ জন নারী রয়েছেন।
গতকাল মিয়ানমার সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত’ এলাকাগুলোতে বিমানবাহিনীর ঘন ঘন বিমান অভিযান নিহতের সংখ্যা এত বেশি হওয়ার জন্য এককভাবে দায়ী।
২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লেইং ওই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। পরে তিনি সামরিক সরকারের প্রধান হন।
সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর দেশজুড়ে সেনাবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠে। দেশের অনেক অঞ্চল থেকে সেনা কর্মকর্তাদের সরিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তারা। এসব এলাকা পুনরুদ্ধারে দফায় দফায় সামরিক অভিযান শুরু করে সরকার।
মিয়ানমারের ১৪টি প্রশাসনিক ইউনিটের মধ্যে সাতটি রাজ্য এবং সাতটি অঞ্চল রয়েছে। রাজ্যগুলো হলো চিন, কাচিন, কায়াহ, কায়িন, মন, রাখাইন ও শান। আর অঞ্চলগুলো হলো ইরাবতী, মাগওয়ে, মান্দালয়, বাগো, ইয়াঙ্গুন, সাগাইং এবং তানিনথারি।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজ্য ও অঞ্চলগুলোর মধ্যে সাগাইংয়ে সবচেয়ে বেশি ১৯১ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩০ জন শিশু এবং ৬০ জন নারী রয়েছেন।
গত অক্টোবরে সাগাইংয়ের চাউং-ইউ এলাকায় একটি স্কুলের সামনে জড়ো হওয়া বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বিমান হামলায় চার শিশুসহ ২৩ জন নিহত এবং ৬০ জনের বেশি আহত হন। হামলার সময় তারা মোমবাতি প্রজ্বালনের মাধ্যমে বৌদ্ধ উপবাসের সমাপ্তি উদযাপন করছিলেন।
এ সময় তারা রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিরোধিতা এবং সামরিক নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের আহ্বানও জানাচ্ছিলেন।
ডিসেম্বরে সাগাইংয়ের তাবায়িন অঞ্চলে একটি চায়ের দোকানে ফুটবল ম্যাচ দেখার জন্য জড়ো হওয়া মানুষের ওপর সামরিক বিমান থেকে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ১৯ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হন।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের বিষয়ও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা হত্যাকাণ্ড, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার পাশাপাশি আরাকান আর্মিতে যোগ দিতেও বাধ্য হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, “মিয়ানমারের মানুষ সামরিক বাহিনীর হাতে ইতোমধ্যে যথেষ্ট ভোগান্তির শিকার হয়েছে, আর এখন মনে হচ্ছে দেশের বাইরের মানুষ তাদের কথা ভুলে গেছে।”
তিনি বলেন, “অবিরামভাবে সেনাবাহিনীর লক্ষ্যবস্তু হওয়া এবং নির্বিচার হামলা থেকে বাঁচতে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ দিত সাধারণ মানুষ। নির্বাচনের পর থেকে এই ব্যবস্থাটি ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে সেনাবাহিনী, যা সংকটকে আরও গভীর করেছে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানের পর দুই বছরেরও বেশি আগে বিদ্রোহীরা বেশ কিছু এলাকায় সাফল্য পেলেও পরে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগ এবং ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে দেশের বেশিরভাগ এলাকায় এখন সামরিক বাহিনী আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে।
গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হন মিন অং হ্লেইং। তবে নির্বাচনের ফল আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল বলে দাবি করেছে গণমাধ্যম। অনেক জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি এবং গৃহযুদ্ধের কারণে দেশের বড় একটি অংশে ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি।
বর্তমান পার্লামেন্টে জেনারেল-অনুগত সদস্যদের প্রাধান্য রয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এক-চতুর্থাংশ আসন সংরক্ষিত রয়েছে। সামরিক বাহিনীর সমর্থিত দল ইউএসডিপি বাকি আসনের প্রায় ৮০ শতাংশ জয় করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.