নানা আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক ও দাবির পর ফ্লোরপ্রাইস নামের ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি মিলেছে এক সময়ের মার্কেট মুভার (Market Mover) বেক্সিমকো লিমিটেড। একইসঙ্গে মুক্তি পেয়েছে এক সময়ের সর্বোচ্চ বাজারমূলধনধারী কোম্পানি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। কোম্পানি দুটি প্রায় ৬ বছর ফ্লোরপ্রাইসের বন্দীদশায় আটকে ছিল। আজ সোমবার (৮ জুন) কোম্পানি দুটির উপর থেকে ফ্লোরপ্রাইস প্রত্যাহার করে নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ফলে আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে স্বাভাবিক লেনদেনে থাকবে আলোচিত দুই কোম্পানি।
দেশের পুঁজিবাজারে প্রথম ফ্লোরপ্রাইস আরোপ করা হয় ২০২০ সালের ১৯ মার্চ। ওই বছরের ৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের খবরে পুঁজিবাজারে টানা দরপতন শুরু হলে তা ঠেকাতে বিএসইসি প্রথমবারের মতো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে। পরবর্তীতে ওই বছরের ৭ এপ্রিল থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ফ্লোরপ্রাইস তুলে নেওয়া হয়।
শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞরা ফ্লোরপ্রাইসের বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাদের মতে, পুঁজিবাজারে সব সময় স্বাভাবিক ও ফ্রি লেনদেনের সুযোগ থাকা উচিত। ফ্লোরপ্রাইস এই বাজারের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে এটি বিদেশী বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক মহলে ভুল বার্তা পাঠাবে। বাস্তবেই তেমনটি দেখা গেছে। প্রথম দফার ফ্লোরপ্রাইস প্রত্যাহারের পর অনেক বিদেশী বিনীয়োগকারী বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করে মূরধন প্রত্যাহার করে নেয়। তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আবারও বাজারে ফ্লোরপ্রাইস আরোপ করা হয়। গত বছরের শেষভাগে বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংক ছাড়া বাকী কোম্পানিগুলোর উপর থেকে পর্যায়ক্রমে ফ্লোরপ্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। বড় মূলধনসম্পন্ন কোম্পানি দুটির উপর থেকে ফ্লোরপ্রাইস তুলে নেওয়া হলে স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যসূচকে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এমন আশংকায় আগের কমিশনগুলো বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংককে মুক্তি দেয়নি। অবশেষে সদ্য নিযুক্ত বিএসইসির কমিশন কোম্পানি দুটির ফ্লোরপ্রাইস প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংকের ফ্লোরপ্রাইস প্রত্যাহারের বিষয়টিকে পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক সময়ের বড় ঘটনা মনে করা হচ্ছে। নতুন কমিশনের জন্য বিষয়টি এক ধরনের অগ্নিপরীক্ষার মতোও। বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষক বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, একটু সুস্থ ও স্বাভাবিক বাজারের জন্য সকল বিনিয়োগকারী, কোম্পানি ও মধ্যবর্তী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্র আইনের সমান প্রয়োগ জরুরি। এটি বিদেশী বিনিয়োগকারীদরকেও ইতিবাচক বার্তা দেবে।
তবে অনেকে মনে করছেন, কিছুটা ভুল সময়ে কোম্পানি দুটিকে স্বাভাবিক লেনদেনে ফেরানো হচ্ছে। এমনিতেই গত কয়েক বছরের ব্যবধানে কোম্পানি দুটির আর্থিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি হয়েছে। তৈরি হয়েছে ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সংকট। এর মধ্যে বাজার প্রবেশ করেছে মূল্য সংশোধনে। টানা ১০ কার্যদিবস বাজারে মূল্যসূচক টানা বৃদ্ধির পর গতকাল থেকেই মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে। বেড়েছে বিক্রির চাপ। অন্যদিকে প্রায় দু’মাসের যুদ্ধ বিরতির পর রোববার ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ও হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। এতে নতুনভাবে অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসবের প্রতিফলন দেখা গেছে সোমবারের বাজারচিত্রে। এদিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৩৩ দশমিক ১৬ পয়েন্ট (০.৬০%) কমেছে। বাজারে লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ কোম্পানি শেয়ারের মূল্য হারিয়েছে। অন্যদিকে ডিএসইতে লেনদেন কমেছে ৪৫০ কোটি টাকা, যা প্রায় ৩০ শতাংশ। আগের দিন ডিএসইসিতে এক হাজার ৫২৯ কোটি টাকার লেনদেন হলেও সোমবার তা এক হাজার ৭২ কোটি টাকায় নেমে আসে।
তবে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিতে পারলে কোম্পানি দুটির লেনদেন বাজারের সামগ্রিক লেনদেন বাড়াতে ভাল ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ দুটি কোম্পানিরই পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ অনেক। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে বিপুল সংখ্যক শেয়ার। এগুলো লেনদেনযোগ্য হলে বাজারে মোট লেনদেন বাড়বে। তাছাড়া এসব শেয়ারে আটকে থাকা মূলধন বিনিয়োগকারীদের কাছে ফিরে এলে তারা নতুনভাবে তাদের পোর্টফোলিও পুনর্গঠন করার সুযোগ পাবেন, এই অর্থ তারা অন্য শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারেন। তাতে অন্যান্য শেয়ারের লেনদেনও বাড়বে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.