চলমান যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার মধ্যেই দুই দেশ নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত সমঝোতা চুক্তির খসড়ায় কিছু পরিবর্তন চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সপ্তাহান্তে ইরানের ভেতরে কয়েকটি রাডার ও কমান্ড-নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর দিয়ে উড়তে থাকা একটি এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনায় ইরানের ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের’ জবাব হিসেবে এসব হামলা চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়, মার্কিন যুদ্ধবিমান দ্রুত অভিযান চালিয়ে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি স্থল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং দুটি একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন ধ্বংস করেছে, যেগুলো আঞ্চলিক জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, ইরানের সিরিক দ্বীপে একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালানোর জন্য ব্যবহৃত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে তারা পাল্টা আঘাত হেনেছে। তবে কোন ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়নি।
ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ দাবি করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত করা হয়নি।
এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। গত সপ্তাহেও কুয়েত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ার কথা জানিয়েছিল। তবে এসব উত্তেজনার পরও যুদ্ধবিরতি এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
চুক্তির খসড়ায় পরিবর্তন চান ট্রাম্প
চলমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি সমঝোতা স্মারক, যা দুই দেশের মধ্যে বৈরিতা কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরি করবে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, শুক্রবার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প খসড়ায় কিছু সংশোধনের প্রস্তাব দেন। তিনি বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত অঙ্গীকার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে আরও কঠোর ভাষা সংযোজনের পক্ষে মত দিয়েছেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, “ইরান সত্যিই একটি চুক্তি করতে চায় এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্র ও আমাদের মিত্রদের জন্য ভালো হবে।”
তবে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিদেশি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের চাওয়া পরিবর্তনগুলো মূলত নিশ্চয়তা ও প্রতিশ্রুতির ভাষা ঘিরে, বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তন নয়।
চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে কী ধরনের আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলের পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে তুলনা এড়িয়ে চলতে চান।
এদিকে শত্রুর প্রতিশ্রুতিতে আস্থা নেই জানিয়ে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, তেহরানের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি অনুমোদন করা হবে না।
আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমকে তিনি বলেন, “কূটনৈতিক অঙ্গনের যোদ্ধারা শত্রুর কথাবার্তা ও প্রতিশ্রুতির ওপর কোনো আস্থা রাখেন না। আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তব অর্জন।”
অন্যদিকে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেই মূল উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের চাপ মোকাবিলায় মার্কিন নৌবাহিনীকে দেশটির বন্দর অবরোধ এবং প্রণালিতে পাতা মাইন অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প।
সেন্টকম জানিয়েছে, শুক্রবার গাম্বিয়ার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ইরানের দিকে যাওয়ার সময় সতর্কবার্তা অমান্য করায় তার ইঞ্জিন কক্ষে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে অচল করে দেওয়া হয়েছে। অবরোধ শুরু হওয়ার পর এটি পঞ্চম বাণিজ্যিক জাহাজ, যেটিকে মার্কিন বাহিনী অচল করেছে। একই সময়ে শতাধিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে।
যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের পরিচালক কেভিন হ্যাসেট জানিয়েছেন, সরকারের কৌশলগত মজুত এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে এখনো বিপুল পরিমাণ তেল মজুত রয়েছে।
তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় মূল্য প্রতি গ্যালনে ৪ দশমিক ৩৪ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে কয়েক সপ্তাহ থেকে দুই মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সূত্র: সিএনএন।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.