সিলিয়াকের রোগীদের চিকিৎসার প্রয়োজনে গ্লুটেনমুক্ত খাবার খেতে হয়। কিন্তু যুক্তরাজ্যে আকাশছোঁয়া দামের কারণে সাধারণ মানুষের পক্ষে এখন গ্লুটেনমুক্ত খাবার কেনা দায় হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে দেশটিতে গ্লুটেনমুক্ত ছোট এক প্যাকেট পাউরুটির দাম এখন ৪ পাউন্ড বা প্রায় ৬৫০ টাকা। ফলে সিলিয়াকের রোগীদের জন্য গ্লুটেনমুক্ত খাবার কেনা রীতিমতো বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
সাধারণ গম বা আটার তৈরি খাবার যাঁরা হজম করতে পারেন না এবং এসব খাবার খেলে যাঁদের পেট ও শরীরে সমস্যা হয়, তাঁদের সিলিয়াকের রোগী ধরা হয়। এটি বিরল জন্মগত সমস্যা, যাতে রোগীর পরিপাকতন্ত্র গ্লুটেনের প্রতি অতি সংবেদনশীল থাকে। আর গ্লুটেন হলো একধরনের প্রোটিন, যা গম, বার্লি, যব, রাই ইত্যাদি শস্যদানায় থাকে।
সিলিয়াকের রোগীদের সহায়তায় কাজ করা ওয়েবসাইট ‘সিলিয়াক স্যাঙ্কচুয়ারি’র পরিচালক অ্যালিসন পিটার্স বলেন, এটি এখন আর কেবল বিশেষ ডায়েট নয়, রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে গেছে। অনেক পরিবারে একাধিক সদস্য এ রোগে আক্রান্ত। তাঁদের জন্য সপ্তাহে কয়েক প্যাকেট পাউরুটি কেনা এখন অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
যুক্তরাজ্যে সাধারণ ৮০০ গ্রামের একটি সাদা পাউরুটি ১ পাউন্ডের (প্রায় ১৬৫ টাকা) কমে পাওয়া যায়। সেখানে মাত্র ৫৫০ গ্রামের একটি গ্লুটেনমুক্ত পাউরুটির জন্য গ্রাহকদের প্রায় দ্বিগুণ দাম গুনতে হচ্ছে। আর নামী ব্র্যান্ডের ৪৪০ গ্রামের এক প্যাকেট পাউরুটির দাম ঠেকেছে ৩ দশমিক ৯০ পাউন্ডে (প্রায় ৬৪০ টাকা)।
কেন এত দাম
তথ্য বলছে, গত এক বছরে গ্লুটেনমুক্ত পাউরুটির দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ এবং ময়দার দাম বেড়েছে ১০ শতাংশের বেশি। শুধু দামই বাড়েনি, কমেছে প্যাকেটের ওজনও। সাধারণ কর্নফ্লেক্সের চেয়ে গ্লুটেনমুক্ত কর্নফ্লেক্সের দাম প্রায় দ্বিগুণ, কিন্তু পরিমাণে তা অর্ধেক। এমনকি এককাপ চায়ের সঙ্গে দুটো বিস্কুট খাওয়ার মতো অবস্থাও অনেকের নেই। কারণ, মাত্র ৮টি বিস্কুটের একটি প্যাকেটের দাম পড়ছে প্রায় ২৪০ টাকা (১ দশমিক ৬০ পাউন্ড)।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর এবার ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি চলতি বছরের শেষ নাগাদ ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশেষায়িত খাবারের বাজারে।
নিকোল মারভিন নামের এক ভোক্তা বলেন, ‘সস্তার দোকানগুলো থেকে গ্লুটেনমুক্ত পণ্য সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখন বাধ্য হয়ে দামি দোকান থেকে তা কিনতে হচ্ছে। জীবন বাঁচানোর জন্য যে খাবার প্রয়োজন, তা এখন আমাদের নাগালের বাইরে।’
‘সিলিয়াক ইউকে’ নামক একটি দাতব্য সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে, গ্লুটেনমুক্ত খাদ্যাভ্যাস সাধারণ খাবারের চেয়ে অন্তত ৩৫ শতাংশ বেশি ব্যয়বহুল। অর্থাভাবে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৩ জন রোগী জেনেশুনে এমন খাবার খাচ্ছেন যাতে গ্লুটেন থাকার সম্ভাবনা আছে। এটি তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
উৎপাদনকারীরা বলছেন, গ্লুটেনমুক্ত খাবার তৈরি করা সহজ কাজ নয়। সাধারণ খাবারের কারখানায় এটি তৈরি করা যায় না। কারণ, সামান্য গ্লুটেনের সংমিশ্রণও রোগীদের জন্য বিষতুল্য হতে পারে। আলাদা কারখানা, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও সাম্প্রতিক সময়ে কাঁচামালের সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে সাধারণ মানুষ এখন বিশেষায়িত খাবারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে কোম্পানিগুলোও নতুন করে গ্লুটেনমুক্ত পণ্য বাজারে আনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ২০১৯ সালেও যেখানে নতুন খাবারের ১৯ শতাংশ ছিল গ্লুটেনমুক্ত, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ শতাংশে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.