বিদেশি কোম্পানি অধিগ্রহণে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভারতীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। একের পর এক বড় আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়; বরং কৌশলগত প্রয়োজন ও দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশের সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন।
সম্প্রতি ভারতের সান ফার্মাসিউটিক্যালস নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত জৈবপ্রযুক্তিভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি অর্গানন অ্যান্ড কোম্পানি অধিগ্রহণে সম্মত হয়েছে। এ জন্য তারা ব্যয় করছে ১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১৭৫ কোটি মার্কিন ডলার। প্রায় দুই দশকের মধ্যে কোনো ভারতীয় কোম্পানির বিদেশে এটিই সবচেয়ে বড় অধিগ্রহণ।
শুধু সান ফার্মা নয়, ভারতের আরও কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে।
টাটা মোটরস ইতালিভিত্তিক যানবাহন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আইভেকোকে ৪৪০ কোটি ডলারে অধিগ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কোফোর্জ সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি এনকোরাকে ২৩৫ কোটি ডলারে কিনেছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের শুরুতে বিমা প্রতিষ্ঠান অ্যালিয়ান্জ এসইর ২৩ শতাংশ শেয়ারও অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রান্ট থর্নটনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৬২টি ভারতীয় কোম্পানি বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিনতে ১৮ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। আগের বছরের তুলনায় যা ৩৪ শতাংশ বেশি।
গ্রান্ট থর্নটনের অংশীদার সুমিত আব্রোলের মতে, চলতি বছরের প্রথমার্ধেই বিদেশি অধিগ্রহণের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় কোম্পানিগুলোর এই বিদেশমুখী প্রবণতার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
ভারতের শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরে যাওয়া, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং দেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের সীমাবদ্ধতা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশে সুযোগ খুঁজতে উৎসাহিত করছে।
ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরন জানিয়েছেন, কোভিড-পরবর্তী সময়ে শীর্ষ ৫০০ কোম্পানির মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ হয়নি।
মারসেলাস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার্সের সৌরভ মুখার্জিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে শিল্পের জন্য সহজে জমি ও কার্যকর মূলধন পাওয়া যায়। ফলে ভারতীয় কোম্পানিগুলো বিদেশে কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি কোম্পানি অধিগ্রহণের মাধ্যমে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু নতুন বাজার নয়, একই সঙ্গে প্রযুক্তি, গবেষণা, উন্নয়ন সক্ষমতা, ব্র্যান্ড মূল্য এবং বৈশ্বিক বিতরণ নেটওয়ার্কও অর্জন করতে চাইছে।
তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ট্র্যাক্সনের সহপ্রতিষ্ঠাতা নেহা সিং বলেন, বৈশ্বিক অর্থায়ন সহজলভ্য হওয়ায় এই সম্প্রসারণের গতি বেড়েছে। দেশের ভেতরে দীর্ঘ সময় নিয়ে যা গড়ে তুলতে হতো, বিদেশি অধিগ্রহণের মাধ্যমে তা দ্রুত অর্জন সম্ভব হচ্ছে।
তবে সব বিদেশি অধিগ্রহণ সফল হয় না। অতীতে করাস স্টিল অধিগ্রহণের পর টাটা স্টিলকে দীর্ঘ সময় আর্থিক চাপে থাকতে হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে অধিকাংশ চুক্তি নগদ অর্থে সম্পন্ন হচ্ছে। শেয়ারভিত্তিক বিনিময় তুলনামূলক কম হওয়ায় আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে। সান ফার্মার সাম্প্রতিক অধিগ্রহণও পুরোপুরি নগদ অর্থে সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলো ভবিষ্যতে এই বিদেশমুখী বিনিয়োগ আরও বাড়াবে।
একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ভারতীয় করপোরেট নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং ডলারের বিপরীতে রুপির ধারাবাহিক অবমূল্যায়নও বিদেশি সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে।
সব মিলিয়ে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ দুর্বলতা ও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় ভারতীয় কোম্পানিগুলোর বিদেশি অধিগ্রহণের ধারা আগামী দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.