চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে গভীর রাতে এক ভয়াবহ ও পরিকল্পিত সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে র্যাব ও যৌথ বাহিনীর সদস্যরা পাল্টা গুলি চালালে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। কুখ্যাত ‘ইয়াসিন বাহিনী’র সদস্যরা এই হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে র্যাব।
র্যাব-৭-এর কমান্ডিং কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, গত রবিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে এই অতর্কিত হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে যৌথ বাহিনীর যাতায়াত পথ বন্ধ করতে বেশ কিছু জায়গার রাস্তা কেটে দেয় এবং কালভার্ট ভেঙে ফেলে। এমনকি তারা বুলডোজার ব্যবহার করে যৌথ বাহিনীর নির্মাণাধীন ক্যাম্পের সীমানা প্রাচীর ধসিয়ে দেয়।
র্যাব কর্মকর্তা আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যৌথ বাহিনীর পক্ষ থেকে ‘নন-লেথাল’ (প্রাণঘাতী নয় এমন) অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। দীর্ঘ দুই ঘণ্টার গোলাগুলি শেষে সন্ত্রাসীরা পিছু হটলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। গতকাল সোমবার সকালে ওই এলাকায় চিরুনি অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছে।
পাহাড়খেকো ও ভূমিদস্যুদের অভয়ারণ্য ‘জঙ্গল সলিমপুর’
চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক সংলগ্ন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত পাশের পাহাড়ি পথ ধরে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করতে হয়। ‘ছিন্নমূল’ ও ‘আলীনগর’—এই দুই ভাগে বিভক্ত বিশাল এই পাহাড়ি অঞ্চলে জেলা প্রশাসনের প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। তারা সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি, অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও মার্কেট নির্মাণ করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চালিয়ে আসছিল। স্থানীয়দের তথ্যমতে, অভিযানের আগে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকা রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন এবং আলীনগর এলাকা ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিনের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
সরকারি মহাপরিকল্পনা:
জঙ্গল সলিমপুরের এই বিশাল সরকারি খাসজমি সন্ত্রাসীদের কবল থেকে উদ্ধার করে সেখানে পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি, কেন্দ্রীয় কারাগারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সেখানে যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল।
পুরোনো সংঘাত ও পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা
এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি একই এলাকায় যৌথ বাহিনীর ওপর বড় ধরনের হামলা চালিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। ওই হামলায় র্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন নিহত হন এবং আরও ৩ জন র্যাব সদস্যসহ একজন সোর্স গুরুতর আহত হন। এই ঘটনার পর সীতাকুণ্ড থানায় মামলা হলেও মূল আসামিরা এখনও অধরা। তবে ওই হত্যাকাণ্ডের পর যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে সন্ত্রাসীরা জঙ্গল সলিমপুরের প্রকাশ্য নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, গত ৯ মার্চ পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে এই চক্রের ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন, মশিউর রহমান, নুরুল হক ভাণ্ডারি, গাজী সাদেক ও গোলাম গফুরসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখনও পলাতক রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এলাকা পুনর্দখলের মরিয়া চেষ্টা থেকেই পলাতক সন্ত্রাসীরা নতুন করে এই পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যৌথ বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.