ভারতে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক, তেলাপোকা জনতা পার্টির ঝড়

একটি সাধারণ কৌতুক যে এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত মোড় নেবে, তা কল্পনাতেও ভাবেননি অভিজিৎ দিপকে। ওই কৌতুকের জেরে গত ৭২ ঘণ্টায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তার জোয়ার সামলাতে গিয়ে চোখের পাতা এক করতে পারেননি তিনি।

৩০ বছর বয়সী এই তরুণ যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনসংযোগ বিষয়ে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি নিজেই একটি বিশাল ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন; যার নাম দেওয়া হয়েছে, ককরোচ জনতা পার্টি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অনলাইনে এই আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন।

বুধবার (২০ মে) আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

গত শুক্রবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আদালতের উন্মুক্ত শুনানির সময় বলেন, পরজীবীরা পুরো ব্যবস্থাটাকে আক্রমণ করছে। একই সঙ্গে তিনি তরুণদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যাদের কোনও কর্মসংস্থান নেই এবং পেশাগত কোনও অবস্থান নেই।

তিনি বলেন, কিছু তরুণ আছে তেলাপোকার মতো, যাদের কোনও কর্মসংস্থান নেই বা পেশাগত কোনও অবস্থান নেই। তাদের কেউ গণমাধ্যম হয়ে উঠছে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কেউ তথ্য অধিকার (আরটিআই) কর্মী এবং অন্যান্য অ্যাক্টিভিস্ট সেজে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করেছে।

পরবর্তীতে সূর্য কান্ত অবশ্য তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, জালিয়াতি করে ডিগ্রি অর্জন করা কিছু লোককে উদ্দেশ্য করে তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন। ভারতের যুবসমাজকে লক্ষ্য করে এই মন্তব্য করেননি। দেশটির যুবসমাজকে ‘উন্নত ভারতের স্তম্ভ’ বলে অভিহিত করেন তিনি।

এই ব্যাখ্যার পরও তার এই মন্তব্য দেশটিতে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। বিশেষ করে ‘জেন জি’ প্রজন্মের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা এতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। কারণ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকারের ১২ বছরের শাসনামলে তারা ব্যাপক বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও তীব্র ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মন্তব্য ঘিরে ক্ষোভ তুঙ্গে। এর মাঝেই গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দিপকে বলেন, সব তেলাপোকা যদি এক হয়ে যায়, তাহলে কেমন হবে?

এই কৌতুক এবং এর পেছনে থাকা চরম হতাশা ও ক্ষোভকে পুঁজি করে তিনি ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে ককরোচ জনতা পার্টির অ্যাকাউন্ট ও ওয়েবসাইট চালু করেন। নামটি মূলত নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক রূপ।

মাত্র তিন দিনে তেলাপোকা জনতা পার্টির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের অনুসারী সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। আর গুগল ফর্মের মাধ্যমে দলটির সদস্য পদের জন্য আবেদন করেছেন সাড়ে ৩ লাখেরও বেশি মানুষ।

যারা সদস্য হয়েছেন, তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও রয়েছেন। যেমন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্য বিহারের সাবেক সংসদ সদস্য কীর্তি আজাদ।

ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ভারত সরকারের দমনপীড়নের কথা জানিয়ে আল জাজিরাকে একজন বলেন, গত এক দশকে দেশে চরম ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। ভারত এখন এতটাই ঘৃণায় আচ্ছন্ন যে, এই তেলাপোকা জনতা পার্টি যেন নির্মল বাতাসের ঝাপটা।

গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়া ছিল ‘জেন জি’ বা তরুণ প্রজন্মের ঐতিহাসিক সব আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু; যা শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশে সরকারের পতন ঘটিয়েছে।

ভারতে প্রতি বছর ৮০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক পাস করলেও তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৯ দশমিক ১ শতাংশ।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ বলেন, প্রধান বিচারপতির মন্তব্য তরুণদের প্রতি গভীর বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।

তিনি বলেন, কেউ কেউ এই কৌতুকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, কারণ এটি মজার। আবার কেউ চরম হতাশা থেকে যুক্ত হচ্ছেন।

দিপকে জানান, প্রথম পোস্ট করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি এই অনলাইন দল গড়ে তোলেন এবং এর রূপরেখা তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেন।

বর্তমানে এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনটি মূলধারার রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.