চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে সারা দেশ থেকে তরুণেরা সমবেত হয়েছিলেন এক ছাদের নিচে। তাদের কেউ উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণে প্রথম পদক্ষেপ নিচ্ছেন, আবার কেউ এসেছিলেন নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার গল্প শোনাতে। ব্র্যাকের মেধাবিকাশ উদ্যোগের মাধ্যমে নির্বাচিত ৮০ জন শিক্ষার্থী ও ২০ জন অ্যালামনাইকে নিয়ে সাভারের বিসিডিএমে অনুষ্ঠিত হয় মিলনমেলা।
মঙ্গলবার (১২ মে) ব্র্যাকের ‘মেধাবিকাশ সংযোগ ২০২৬: মেধার আলোয় আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই বিশেষ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। ব্র্যাক সেই সব মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে যাদের পারিবারিক আয় মাসিক ২০ হাজার টাকার নিচে, আর্থিক কারণে তাদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ৬ হাজার ১৬১ জন শিক্ষার্থী মেধাবিকাশ বৃত্তির জন্য আবেদন করেন। এর মধ্য থেকে নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ৪০০ জন শিক্ষার্থীকে নির্বাচিত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ এবং শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও অভিবাসন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান। ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীরসহ শিক্ষাবিদ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
“পৃথিবীটা সবার জন্য সমান নয়,”—এই সরল সত্যটি দিয়ে কথা শুরু করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্। তিনি বলেন, যে সুযোগ নিয়ে জন্মায়, তার পথ মসৃণ; আর যে বঞ্চিত, তার পথে বাধা প্রতিটি পদে। ব্র্যাক সেই বাধার মুখে দাঁড়িয়ে মানুষের হাতে হাতিয়ার তুলে দেয়, শুধু টিকে থাকার জন্য নয়, নিজের শর্তে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।
তবে এই যাত্রা এখানেই শেষ নয় বলে মনে করেন তিনি। আজ যারা এই সুযোগ পাচ্ছেন, আসিফ সালেহ্ তাদের কাছে একটি প্রত্যাশা রাখেন — আগামীতে তারা যেন সহমর্মী হয়ে অন্য বঞ্চিতদের পাশে এসে দাঁড়ান। মেধা বিকাশের পুরনো অ্যালামনাইদের উদ্দেশে তিনি বিশেষভাবে আহ্বান জানান নতুনদের পথচলায় সঙ্গী হতে।
পাশাপাশি তিনি জোর দেন মানবিক মূল্যবোধের ওপর: ‘সহমর্মিতার দৃষ্টি একবার জেগে উঠলে, তাকে আর ঘুম পাড়ানো যায় না।’ তাঁর বিশ্বাস, একটি মানবিক পৃথিবী গড়ে উঠবে তখনই, যখন আমরা প্রত্যেকে, নিজের নিজের জায়গা থেকে, মানবিক হব।
ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও অভিবাসন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, শুরুতে আমরা ১৫০ জনকে বৃত্তি দিয়েছিলাম, যা এখন ৪০০ জনে উন্নীত হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য এটি ১ হাজার ২০০ জনের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। তরুণদের মেধা, পরিশ্রম ও ত্যাগ অবাক করার মতো। আপনাদের সংগ্রাম এবং ইতিবাচক মানসিকতা প্রশংসনীয়। আমরা আশা করি, এই মেধাবিকাশ সংযোগের মাধ্যমে আপনারা পরস্পরকে সহযোগিতা করবেন। ব্র্যাক পরিবার আপনাদের স্বপ্নপূরণে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করবে।
এবার মেধাবিকাশ উদ্যোগের মাধ্যমে বৃত্তির জন্য নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬০ জন ২৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী, যার মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আছেন ৪৫ জন। বুয়েট ও কুয়েটের মতো শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ১৭ জন শিক্ষার্থী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ১৫ জন এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ১৩ জন শিক্ষার্থী নির্বাচিত হয়েছেন।
কলেজ পর্যায়ে ১০৬টি সরকারি-বেসরকারি কলেজ থেকে ২৫০ জন শিক্ষার্থীকে নির্বাচিত করা হয়েছে, যেখানে নারী শিক্ষার প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মেধাবিকাশ বৃত্তিপ্রাপ্ত ৪০০ জনের মধ্যে ২০৬ জনই ছাত্রী, যা মোট বৃত্তিপ্রাপ্তদের সাড়ে ৫১ শতাংশ। আর কলেজ পর্যায়ে বৃত্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে ছাত্রী ৬০ শতাংশ।
মেধাবিকাশ উদ্যোগের আওতায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা এককালীন ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং মাসিক ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃত্তি পাবেন। যা তাদের আর্থিক দুশ্চিন্তা দূর করে পড়াশোনায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে সাহায্য করবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্র্যাক একটি দক্ষ ও সহমর্মী প্রজন্ম গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যারা আগামীর বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এবারের মেধাবিকাশ সংযোগ আয়োজনটি ছিল অধ্যবসায়, আকাঙ্ক্ষা ও সাফল্যের গল্পে ভরা। এই অনুষ্ঠানে বৃত্তিপ্রাপ্ত নতুন ও অগ্রজরা একত্রিত হন, যাদের পথচলা শুধু মেধা দিয়ে নয় বরং আর্থিক প্রতিকূলতার বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলার। এই আয়োজন তরুণদের অনুপ্রেরণা, সংযোগ এবং সম্মিলিত সম্ভাবনার একটি পরিসর তৈরি করেছে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.