ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি যে কোনো সময় ভেস্তে যেতে পারে। স্থায়ীভাবে যুদ্ধ করার লক্ষ্যে দেশ দুটির মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরে নানামুখী চেষ্টা চললেও ক্রমেই সে সম্ভাবনা ফিকে হয়ে আসছে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে দেশ দুটি। তারা দেশ নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থেকে পরস্পরকে দোষারোপ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবকে ‘অযৌক্তিক দাবি’ বলে বর্ণনা করেছে তেহরান। অপরদিকে ওয়াশিংটন বলছে, ইরানের দাবি ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।’ পাল্টাপাল্টি অনড় অবস্থানের জেরে নতুন করে সংঘাতে শঙ্কা বাড়ছে।
এ অবস্থায় আগামী বৃহস্পতিবার থেকে বেইজিং সফর শুরু করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সূত্র জানিয়েছে, সেখানে তিনি ইরানকে অস্ত্র ও কূটনৈতিক সহযোগিতা থেকে দূরে সরে আসতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে চাপ দেবেন।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। গতকাল তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির অবস্থা অবিশ্বাস্যভাবে দুর্বল। আমি বলতে চাই যুদ্ধবিরতি বড় ধরনের লাইফ সাপোর্টে আছে। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ‘স্যার আপনার প্রিয়জনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ’ বলে হেঁটে চলে যান।
গত এপ্রিলের প্রথমার্ধে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এর মধ্যেই চুক্তিতে না পৌঁছলে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ অবস্থায় দুপক্ষই তাদের দাবির তালিকা একে অন্যের কাছে হস্তান্তর করেছে। সর্বশেষ এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারক ইরানের কাছে হস্তান্তর করে যুক্তরাষ্ট্র।
সোমবার আলজাজিরা জানায়, ওই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে ‘অযৌক্তিক দাবি’ দিয়েই যাচ্ছে। তিনি তাদের উপস্থাপিত দাবিকে ‘অতিরঞ্জিত নয়’ বলেও বর্ণনা করেন। বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করা ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ইরানের প্রস্তাবটি একটি ‘বৈধ’ দাবি। জবাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরেছে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রস্তাবের জবাবে ইরানের দেওয়া জবাব প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্রুত প্রত্যাখ্যানের ফলে গতকাল সোমবার তেলের দাম আবারও বেড়েছে। সেই সঙ্গে গত ১০ সপ্তাহ ধরে চলা এ সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
ওয়াশিংটন পুনরায় আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব দেওয়ার কয়েক দিন পর গত রোববার ইরান জবাব দেয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ইরানের প্রস্তাবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তেহরান যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণও দাবি করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নৌ অবরোধ শেষ করতে ও কোনো হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা দিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে ও ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প একটি সামাজিক মাধ্যম পোস্টে এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ইরানের প্রস্তাব প্রসঙ্গে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘আমি এটা পছন্দ করছি না– একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।’
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ আরও বিতর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছিল। তেহরান গতকাল সোমবার নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে এর জবাব দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘আমাদের দাবি ন্যায্য– যুদ্ধ বন্ধ করা, (মার্কিন) অবরোধ ও জলদস্যুতা তুলে নেওয়া এবং মার্কিন চাপের কারণে ব্যাংকে অন্যায়ভাবে জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা।’
এ অবস্থায় দুর্যোগময় একটি পরিস্থিতির শঙ্কায় বিভিন্ন দেশ জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আলজাজিরা জানায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বর্ণ কেনা পরিহার ও জ্বালানির খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণেরও আহ্বান জানান। ভারতের ৯০ শতাংশ এলএনজি আমদানি হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধের কারণে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ রয়েছে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.