হরমুজ প্রণালি দুই দিক থেকে অবরুদ্ধ হওয়া যুগান্তকারী ঘটনা, যার প্রভাব দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তেল ও গ্যাস আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য, বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য এটি দুর্ভোগ ডেকে আনছে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরীয় রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্যও তা সংকট তৈরি করেছে।
বিষয়টি হলো, উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তেল বিক্রি করে বিপুল ধনসম্পদের মালিক হয়েছে, কিন্তু এখন তাদের রপ্তানির পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিপরীতে, এই অঞ্চলের বাইরের জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য তা বড় সুযোগ হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। বলে রাখা দরকার, তেল ও গ্যাস, অর্থাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি জ্বালানির সবচেয়ে বড় উৎপাদক দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। খবর গণমাধ্যমের।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দামে তেল বিক্রি করতে পারছে। এই তালিকায় সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম এখন যুক্তরাষ্ট্র। উল্লেখ করা প্রয়োজন, পৃথিবীতে বাণিজ্যিকভাবে তেল উৎপাদন প্রথম শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে, সেই ১৮৫৯ সালে। পরবর্তী সময় তেল বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ওপেকের হাতে। যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনও কমে যায়। কিন্তু এক দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে দেশটি জ্বালানি ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে উৎপাদনে আধিপত্য বিস্তার করেছে। সেই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেল এখন তাদের হাতে। চলমান ইরান যুদ্ধের কল্যাণে তেল বাণিজ্যে তাদের এই আধিপত্য আরও শক্তিশালী হয়েছে।
জিব্রাল্টার প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেও যুক্তরাষ্ট্রের পালে হাওয়া লেগেছে। ফলাফল, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহকারী এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই প্রথম নিট অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকের রপ্তানি সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে তারা উৎপাদনের কেবল একটি অংশ পরিবহন করতে পারছে। অন্যদিকে কুয়েত ও বাহরাইন বিশ্ববাজারে এক ব্যারেল তেলও বিক্রি করতে পারছে না। ফলে মার্কিন তেলের ক্রেতা পাওয়া এখন অনেক সহজ।
গণমাধ্যমের সংবাদে বলা হয়েছে, এশিয়া ও ইউরোপে মার্কিন তেলের রপ্তানি হঠাৎই অনেকটা বেড়ে গেছে। এই দুই মহাদেশ এখন পারস্য উপসাগরের বিকল্প খুঁজতে মরিয়া। শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, ডিজেল ও কেরোসিনের চাহিদাও বেড়েছে, এসবের ঘাটতি এখন তীব্র। আর এ সবই বিক্রি হচ্ছে অনেক বেশি দামে।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করছে। তবে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সাধারণ মার্কিন ভোক্তাদের ওপরেও পড়ছে। বিশ্বের অন্য দেশের মানুষের মতো তারাও এখন পেট্রলপাম্প থেকে গাড়িতে জ্বালানি ভরতে বা উড়োজাহাজের টিকিট কিনতে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ গুনছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন জ্বালানির গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫০ ডলার, অর্থাৎ প্রতি লিটারে এক ইউরোর কিছু বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সপ্তাহে দেশটির তেল রপ্তানি দৈনিক ৬০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, নতুন রেকর্ড। তেহরানে তারা যখন হামলা শুরু করল, তার আগের তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ। এরপরই হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণত বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এখন সেটি কার্যত পরিত্যক্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে পরিশোধিত জ্বালানি যুক্ত করলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট রপ্তানি দৈনিক ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, এটিও নতুন রেকর্ড। বিশেষ করে ইউরোপে ডিজেল রপ্তানি বেড়ে যাওয়ায় এই উল্লম্ফন। অথচ ২০১৪ সালের আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কার্যত কোনো তেল রপ্তানিই করত না। এরপর ফ্র্যাকিং প্রযুক্তির বিস্তার শুরু হয়। তখন বিশেষজ্ঞ মহলের বাইরের মানুষ এই প্রযুক্তি সম্পর্কে তেমন কিছু জানত না।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর গ্লোবাল এনার্জি পলিসির গবেষক আইরা জোসেফ গণমাধ্যমকে বলেন, স্বল্প মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র যে লাভবান হচ্ছে, তা স্পষ্ট। তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীরা কঠোর অবরোধের মুখে পড়েছে, ফলে তেলের দাম বেড়েছে। বিষয়টি মার্কিন তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারীদের জন্য বিশাল সৌভাগ্য।
তবে জোসেফ মনে করেন, বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিস্তারের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে পরিবহন খাতে তেলের ব্যবহার কমে যাবে। সেই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কাতার কোণঠাসা
এদিকে গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিতেও নতুন রেকর্ড হয়েছে। শিল্প ও গৃহস্থালির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত এই গ্যাসের রপ্তানি বৃদ্ধির বড় কারণ, তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কাতারের বাধ্য হয়ে পিছিয়ে পড়া। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশটি কার্যত রপ্তানি করতে পারছে না। মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো এই পরিস্থিতির পুরো সুবিধা নিচ্ছে।
বৃহৎ গ্যাস রপ্তানিকারক কাতার যে শুধু রপ্তানি করতে পারছে না তা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান কাতারের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোয় হামলা করেছে। এতে কাতারের ভবিষ্যৎ উৎপাদনসক্ষমতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র রাস লাফান কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কাতার এনার্জির হিসাব অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে দেশটির রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারকই নয়; ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের রপ্তানিসক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হবে। বিষয়টি হবে একধরনের জ্বালানি-বিপ্লব, এর প্রভাব অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক—উভয় ক্ষেত্রেই গভীর। অর্থনৈতিকভাবে মার্কিন শিল্প খাত বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক কম দামে প্রাকৃতিক গ্যাস পাচ্ছে। ভূরাজনৈতিকভাবে দেখলে, এ ঘটনায় তারা যে কৌশলগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা পেয়েছে, তা কল্পনাতীত।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতের এই আমূল পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে মূলত ফ্র্যাকিং প্রযুক্তির কারণে। এই প্রক্রিয়ায় পানি, বালু ও রাসায়নিকের মিশ্রণ পাথরের স্তরে প্রবেশ করিয়ে শেল থেকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করা হয়।
ভবিষ্যতে মার্কিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি বাড়বে। কারণ হিসেবে গণমাধ্যমের সংবাদে বলা হয়েছে, নতুন পাঁচটি বড় প্রকল্প চালু হবে, অর্থাৎ উৎপাদন আরও বাড়বে। সমুদ্রপথের পাশাপাশি পাইপলাইনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, বিশেষ করে মেক্সিকোর সঙ্গে। মেক্সিকোও এখন এই প্রবণতা থেকে লাভবান হতে চায়।
মার্কিন প্রশাসনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশটির নিট প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি ১৮ শতাংশ বাড়বে। তবে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে এবং কাতার আরও বেশি সময় কোণঠাসা থাকলে এই প্রবৃদ্ধির হার আরও বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে নিট রপ্তানি আরও ১০ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে।
কয়েক মাস ধরেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারে পরাশক্তি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি তাঁর আছে প্রবল বিরূপ মনোভাব। সে কারণেই নির্বাচনী প্রচারে তিনি বারবার বলেছেন, ‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’— এখনকার যে ঘটনাপ্রবাহ, তার সঙ্গে এই স্লোগান সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর শূন্যতা পূরণে মার্কিন রপ্তানির এই উত্থান যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য তা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ একটাই, ট্রাম্প-যুগের যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য অংশীদার নয়; সে কথা যেমন ইউরোপের জন্য প্রযোজ্য, তেমনি এশিয়ার জন্যও।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.