ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিচুক্তি হতে যাচ্ছে—এ আশায় বৃহস্পতিবার এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন হয়েছে। তবে মার্কিন ডলারের দর কিছুটা কমেছে। তেলের বাজার বড় পতনের ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা করেছে। তবে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
দীর্ঘ ছুটির পর লেনদেনে ফিরে জাপানের প্রধান শেয়ারসূচক নিক্কেই এই প্রথম ৬২ হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেছে। শক্তিশালী করপোরেট মুনাফা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিনিয়োগ নিয়ে উচ্ছ্বাসের জেরে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের শেয়ারবাজারও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
জাপানের বাইরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ার নিয়ে গঠিত প্রধান সূচক এমএসসিআই ১ শতাংশ বেড়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। চলতি সপ্তাহেই সূচকটি প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ডটকমের জ্যেষ্ঠ আর্থিক বিশ্লেষক শ্রী কাইল রড্ডা বলেন, সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি কার্যকর হলে তা হবে বড় ধরনের অগ্রগতি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, অতীতেও এমন আশাবাদ দেখা গেছে, কিন্তু পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে। তাঁর মতে, আলোচনা অব্যাহত থাকলে এশিয়ার বাজারে ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকবে।
ইরান জানিয়েছে, তারা শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করার লক্ষ্যেই এ প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে এখনো সমাধানে পৌঁছানো যায়নি।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনায় বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। বৃহস্পতিবার সকাল সকাল এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম সামান্য বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১১ ডলারে উঠলেও এ প্রতিবেদনে লেখার সময় তা ৯৮ ডলারে নেমে এসেছে।
অর্থাৎ তেলের দাম এখন ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে। তারপরও যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের যে দাম ছিল, এখন দাম তার চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহারও বেড়েছে। ফলে উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও মূল্যস্ফীতির চাপ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ওসিবিসি ব্যাংকের বিশ্লেষকেরা এক নোটে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে খুলে গেলেও জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি এবং আগাম মজুত বাড়ানোর প্রবণতার কারণে তেলের দাম দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, এ যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তেলের বাড়তি দাম ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় যে বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মুদ্রাবাজারে ইউরোর দর আগের দিনের তুলনায় বেড়েছে, শক্তিশালী হয়েছে ব্রিটিশ পাউন্ড। অন্যদিকে প্রধান ছয়টি মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়েছে, অর্থাৎ ডলার ইনডেক্সের মান কমেছে।
জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দিকেও বিনিয়োগকারীদের নজর আছে। সম্প্রতি ইয়েনের দর হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, নিজেদের দুর্বল মুদ্রাকে সহায়তা দিতে বাজারে হস্তক্ষেপ করছে টোকিও।
ওসিবিসির বিশ্লেষকদের মতে, এখন মূল প্রশ্ন হলো, জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় ইয়েনকে সমর্থন দিতে বাজারে হস্তক্ষেপ চালিয়ে যাবে কি না। তাঁদের ভাষায়, শুধু হস্তক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বদলানো কঠিন হবে। এর জন্য আরও কঠোর সুদনীতি, তেলের মূল্যহ্রাস ও যুক্তরাষ্ট্রে বন্ডের সুদহার হ্রাসের মতো সহায়ক পরিস্থিতির প্রয়োজন হবে।
মার্চে তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে বড় চাপ তৈরি হয়েছিল। তবে এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতির নাজুক পরিবেশ ও সম্ভাব্য চুক্তির আশায় বাজারে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আয় বৃদ্ধির কারণে সেই উচ্ছ্বাস আরও বাড়ছে।
এদিকে শান্তিচুক্তি নিয়ে আশাবাদের কারণে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই শেয়ারসূচক নতুন রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। বড় কোম্পানিগুলোর মুনাফার প্রবৃদ্ধি গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
এদিকে শুক্রবার প্রকাশিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের দিকে এখন বিনিয়োগকারীদের নজর। রয়টার্সের জরিপ অনুযায়ী, এপ্রিলে দেশটিতে নতুন কর্মসংস্থান বাড়তে পারে ৬২ হাজার, মার্চে এ সংখ্যা ১ লাখ ৭৮ হাজারে উঠেছিল।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.