নীতি-নৈতিকতা না মানলে ও প্রতিবাদ না করলে ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়: চট্টগ্রাম সিটি মেয়র

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডাঃ শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন গ্রিন, হেলদি ও টেকসই নগর তৈরীতে কাজ করছে। কিন্তু যত্রতত্র দোকান, নালা নর্দমায় ময়লা ফেলে পুরো নগরীকে আবর্জনার স্তুপে পরিনত করেছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) প্রতিষ্ঠানটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সিটিকরপোরেশন থেকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও পরক্ষনেই আবার সেখানে বসে যাচ্ছেন। ফলে সিটিকরপোরেশনের কর্মকান্ড সেভাবে সফলতা আসছে না। ঠিক একইভাবে মানুষ যখন পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হই, তখন সাধারণত খাবারকেই দায়ি করা হয়| খাবার একটি উপসর্গ মাত্র এর বাইরে আরও অনেক বিষয় জড়িত।

মানুষ ভেজাল খাবার নিয়ে আক্রান্ত হয়ে চুপ মেরে যায়। ফলে পুরো নগরীর ভেজাল খাবরের স্বর্গ রাজ্যে পরিনত। যারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তারা প্রতিবাদী হয়ে উঠছে না। ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯’ এটা কেবল একটি আইন নয়, এটি সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার| এই আইনকে কাজে লাগিয়ে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি সেমিনার আয়োজনকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে বলেন, ফরমালিনযুক্ত ফলমূল, বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে ভেজাল তেল দিয়ে তৈরি খাবার, পচা-বাসি খাবার শরীরকে রোগগ্রস্ত করে, শরীর ধ্বংস করে|

সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অবশ্যই স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করতে হবে| তিনি খাবার-দাবারের ভেজাল প্রতিরোধে আইনের প্রয়োগ, জনসচেতনতা, প্রতিারিত হলে জনগণের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন| তিনি ভেজালমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে এধরনের সেমিনারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, আমি বিশ্বাস করি, এই ধরনের সভা-সেমিনার তরুণদের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগ্রত করবে এবং তারা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে ।

সোমবার (০৪ মে) প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির দামপাড়াস্থ কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম, যুব ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগর এবং প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯: ছাত্র ও তরুণদের করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে উপরোক্ত মন্তব্য করেন।

সিটি মেয়র আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা অতিমুনাফার লোভে খাদ্যে যেমন ভেজাল মিশ্রণ করছে, অন্যদিকে মানুষকে জিম্মি করে নিত্যপণ্যের সংকট তৈরী করছে। এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে নৈতিকতা বিষয়ে জ্ঞান দানের পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের সামাজিক ভাবে বয়কট করতে হবে। ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে প্রণীত আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে এবং ভোক্তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে।

প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর এস. এম. নছরুল কদিরের সভাপতিত্বে যুব ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আবু হানিফের সঞ্চালনায় সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপ-পরিচালক জনাব ফয়েজ উল্যাহ, প্রিমিয়ার ইউনিভাসিটি আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আহমেদ রাজীব চৌধুরী ও জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিসার ফারহান ইসলাম। আলোচনায় অংশনেন প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ট্রেজারার প্রফেসর ড. জাহেদ হোছাইন সিকদার, ক্যাব কেন্দ্রিয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, প্রিমিয়ার ইউনিভাসিটি আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক অনুপ কমুার বিশ্বাস, যুব ক্যাব চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি মোঃ রোজাইন আল রাফি, আইন অনুষদের সহকারী ডিন জনাব তানজিনা আলম চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক হিল্লোল সাহা, সঞ্চয় বিশ্বাস প্রমুখ অনুষ্টানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন।

সভাপতির বক্তব্যে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর এস. এম. নছরুল কদির আমাদের দেশে নিত্যদিনের খাবার-দাবার ও ফলমূলে যে-ভেজাল থাকে সে-সম্পর্কে ও তার ভয়াবহতা সম্বন্ধে আলোকপাত করেন| তিনি বলেন, একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি| শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু জ্ঞান বিতরণের স্থান নয়, বরং সচেতন নাগরিক তৈরির ক্ষেত্র| আমাদের শিক্ষার্থীরা যদি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে সমাজে শোষণ ও প্রতারণা অনেকাংশে কমে যাবে ।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ট্রেজারার প্রফেসর ড. জাহেদ হোছাইন সিকদার এই সেমিনারকে তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে বলেন, বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হলে শুধু প্রশাসনের উপর নির্ভর করলে হবে না; নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে| একজন সচেতন ভোক্তা কখনো প্রতারণার শিকার হয় না, বরং অন্যদেরও সচেতন করে তোলে|

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর-চট্টগ্রামের বিভাগীয় উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ভোক্তা সংরক্ষন আইনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভোক্তাদের প্রতারণা, ভেজাল এবং অসাধু ব্যবসায়িক আচরণ থেকে সুরক্ষা প্রদান করা| কিন্তু বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা মোকাবেলায় সচেতন নাগরিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহমদ রাজীব চৌধুরী বলেন, ভোক্তা অধিকার আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে বলেন, আইনের প্রয়োগ তখনই কার্যকর হয় যখন জনগণ তা সম্পর্কে সচেতন থাকে| শিক্ষার্থীদের উচিত আইনের মৌলিক বিষয়গুলো জানা এবং প্রয়োজনে তা প্রয়োগে সহায়তা করা| তরুণদের মধ্যেই রয়েছে পরিবর্তনের শক্তি ।

চট্টগ্রাম জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিসার জনাব মোহাম্মদ ফারহান ইসলাম বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; উৎপাদক, বিক্রেতা এবং ভোক্তা—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব| খাদ্যে ভেজাল একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা, যার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে ।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অনুপ কুমার বিশ্বাস বলেন, বর্তমান ভোক্তা-নির্ভর সমাজে সচেতনতা ছাড়া অধিকার রক্ষা সম্ভব নয়| শিক্ষার্থীরা যদি এখন থেকেই ভোক্তা অধিকার বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে| এই সেমিনার সেই সচেতনতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ।

ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাংলাদেশের ভোক্তারা সবচেয়ে অসহায়, অসংগঠিত একটি গোষ্টি, যাদের পাশে দাড়ানোর কেউ নাই। যার কারণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের মতো একটি যুগান্তকারী আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই। যারাই সরকারে যায়, তারাই ব্যবসায়ীদের আয়াত্বে চলে যান। তিনি ২৪ সালের গণঅভ্যত্থানের মতো দেশে বৈষম্যীন সমাজ ও ভোক্তার অধিকার প্রতিষ্টায় তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসার আহবান জানান।

সেমিনারে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীবৃন্দ, প্রক্টরিয়াল বডি, বিভিন্ন সংস্থার তরুণ প্রতিনিধি, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকরাসহ দুই শতাধিক অংশগ্রহনকারী অংশগ্রহণ করেন ।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.