বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির চাপ, রুপির দর ইতিহাসের সর্বনিম্নে

একদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে, আরেক দিকে তার অভিঘাতে ভারতীয় মুদ্রা রুপি’র দরপতন হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ভারতের মুদ্রা রুপির দর ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। এরপর কিছুটা বাড়লেও ভারতের বাজারে এখন ডলারের দাম অনেক।

বৃহস্পতিবার প্রতি ডলারের বিপরীতে রুপির মান দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ৩৩। এর মধ্য দাম কিছুটা বেড়েছে। তা সত্ত্বেও এখন প্রতি ডলারের বিপরীতে ৯৪ রুপির ওপরে পাওয়া যাচ্ছে। খবর গণমাধ্যম।

বিষয়টি হলো, বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ উচ্চতায় ওঠে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ওঠে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলার। ফলে ভারতের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির ভারসাম্য নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভারত জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় এই চাপ আরও স্পষ্ট। একই সঙ্গে মূলধনপ্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রুপির এই দরপতন আকস্মিক কিছু নয়। অনেক দিন থেকেই রুপির দর কমছে। ভারতের শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগ চলে যাওয়া এর অন্যতম কারণ। ডলারের বিপরীতে রুপির দরের মনস্তাত্ত্বিক সীমা ছিল ৯০, এই সীমাও শেষমেশ পেরিয়ে গেছে। এখন ভারতের বাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, রুপির দর শিগগির ১০০ হয়ে যাবে।

গত মাসের শেষ দিকে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাবান্ধব কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নেয়। এর জেরে রুপি সামান্য ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, সাম্প্রতিক এই পতনে তা প্রায় মুছে গেছে। ফলে আরও নতুন পদক্ষেপ আসতে পারে কি না, এ নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।

২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত রুপির মান প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে; গত বছরও একই ধরনের পতন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য টানাপোড়েন, দুর্বল মূলধনপ্রবাহ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন—সব মিলিয়ে ভারতের বহিঃখাতের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

এই চাপ অব্যাহত থাকলে ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে তেল আমদানি–সংশ্লিষ্ট লেনদেন সীমিত করা, সোনা আমদানি কমানো বা মুদ্রানীতিতে কড়াকড়ি আরোপের মতো পদক্ষেপ নিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কোটাক সিকিউরিটিজের পণ্য ও মুদ্রা গবেষণা বিভাগের প্রধান অনিন্দ্য ব্যানার্জি গণমাধ্যমকে বলেন, এই পতন মূলত বাজারে চক্রাকার প্রতিক্রিয়ার উদাহরণ। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অর্থপ্রবাহ কমছে, এতে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। তেল আমদানিকারকেরাও বেশি ডলার কিনছেন। ফলে স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রচেষ্টা চাপের মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, শুধু এপ্রিলেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের বাজার থেকে ৭৫০ কোটি ডলার তুলে নিয়েছেন। ফলে গত অর্থবছরে ২ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ বেরিয়ে গেছে।

একই সময়ে তেল আমদানির ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে—ফেব্রুয়ারিতে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ৭২ ডলার, আজ তা ১০৮ ডলার। বাণিজ্যঘাটতি ও মূলধন হিসাব—দুদিক থেকেই চাপ তৈরি হওয়ায় রুপির কোনো স্বাভাবিক সুরক্ষাবলয় থাকছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে; তবে লক্ষ্য নির্দিষ্ট বিনিময় হার ধরে রাখা নয়, বরং অস্থিরতা কমানো। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করে পতনের গতি কমানো হচ্ছে। ব্রেন্টের দাম ১১৫ ডলারের ওপরে থাকলে এবং বিদেশি বিনিয়োগ কমতে থাকলে ডলার–রুপি বিনিময় হার ঊর্ধ্বমুখী থাকারই সম্ভাবনা।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ডলার–রুপির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ স্তর ৯৬। রুপির দর স্থায়ীভাবে এই স্তর অতিক্রম করলে ৯৭-এর দিকে যাওয়ার পথ খুলতে পারে। বিশেষ করে তেলের দাম আরও বাড়লে এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। ফলে গত বছর এটি এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা হিসেবে চিহ্নিত হয়। শুধু ডলার নয়, ব্রিটিশ পাউন্ড, ইউরো, জাপানি ইয়েন ও চীনা ইউয়ানের বিপরীতেও রুপির দর কমছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে এশিয়ার অন্যান্য মুদ্রার মতো রুপির ওপরও চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.