ভ্যাট নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এর কর্মকর্তারা ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা)। সংগঠনটির মহাসচিব রিয়াজ আহমেদ খান বলেছেন, ভ্যাট নিয়ে বিরাট সমস্যা তৈরি হয়েছে। সমস্যায় পড়ে অনেকে ব্যবসা ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন।
তিনি বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে আসছি, চুরি করার জন্য আসিনি। আমাদের ভ্যাট আইন আছে, কিন্তু আইন কার্যকর না করে ভ্যাট অফিসাররা যে যেভাবে পারছেন ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছেন।
শনিবার (২ মে) রাজধানীতে বারভিডা আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বারভিডার দাবি তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
বারভিডার মহাসচিব বলেন, ব্যবসায়ীরা সীমাহীন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, ভ্যাটের আইন থাকলেও এর সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তারা নিজেদের মতো করে আইন প্রয়োগ করছেন, যার ফলে ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে যথাযথ নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
এ ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে আসছি, চুরি করতে না। ব্যবসায়ীরা সৎভাবে ব্যবসা করতে চান এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান ও অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে রিয়াজ আহমেদ বলেন, এমন একটি ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ব্যবসায়ীরা হয়রানিমুক্তভাবে কাজ করতে পারেন এবং সরকারের প্রয়োজনে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিতে পারেন।
সংবাদ সম্মেলনে বারভিডার সহ-সভাপতি হাবিবুর রহমান খান বলেন, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ভ্যাট সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে এরই মধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে। তবে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবসায়ীকে ভ্যাট অডিটের আওতায় আনা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা যুক্তিসঙ্গত নয়।
হাবিবুর রহমান খান আরও বলেন, অডিট প্রক্রিয়া সাধারণত র্যান্ডম হওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ বা সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ ব্যবসায়ীকে অডিটের আওতায় আনা যেতে পারে। কিন্তু চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে প্রায় সব ব্যবসায়ীকে একযোগে অডিটের মধ্যে আনা হচ্ছে, যা বৈষম্যমূলক বলে মনে হচ্ছে। সাত বছরের পুরোনো হিসাব চাওয়া হচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এসময় তিনি উল্লেখ করেন, করোনা মহামারির সময় সরকার নিজেই ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ নির্দেশনা দিয়েছিল, অনেক অফিস বন্ধ ছিল। সে সময় ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবে নথিপত্র সংরক্ষণ বা হিসাব-নিকাশ ঠিকভাবে রাখতে পারেননি। এখন সেই সময়ের হিসাব চাওয়া হলে অনেকের পক্ষেই তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এর ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। হাবিবুর রহমান খান বলেন, কোনো কোনো সাধারণ ব্যবসায়ীর ওপর চার কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়েছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং অসহনীয়।
তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি করছে। অনেকেই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন, এমনকি দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।
এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ওপর কেন এমন বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা ও সমাধান কামনা করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বারভিডার সভাপতি আবদুল হক আগামী অর্থবছরের বাজেটে সংগঠনটির দাবিগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জ্বালানি সাশ্রয়ী হাইব্রিড ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ওপর বিদ্যমান শুল্ক হ্রাস করা জরুরি।
একই সঙ্গে গণপরিবহন হিসেবে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং জাপান থেকে আমদানি করা রিকন্ডিশন্ড ইলেকট্রিক গাড়ির (ইভি) ওপর কর কমানোর দাবি জানান তিনি।
আবদুল হক বলেন, ইলেকট্রিক গাড়ি শিল্পে সরকারের বিদ্যমান প্রণোদনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানিতে কর ছাড় দিলে বাজারে পরিবেশবান্ধব গাড়ির ব্যবহার বাড়বে। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি ব্যয় কমবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে।
বারভিডা সভাপতি জানান, প্রস্তাবিত সুবিধাগুলো বাস্তবায়ন করা হলে গাড়ির দাম মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। ফলে বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, দেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে মোটরযান খাতে যুক্তিসংগত শুল্ক কাঠামো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হবে।
আবদুল হক আরও বলেন, প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে দেশে মানসম্মত, নিরাপদ ও স্মার্ট পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.