পুরনো বছরের আবর্জনা দূর করতে আজ এসেছে বাঙালির প্রাণের উৎসব-পহেলা বৈশাখ। দিনটি প্রতিবছর নবশক্তি, নবোদ্যম এবং গভীরতর সাংস্কৃতিক চেতনা নিয়ে ফিরে এসে আরো উজ্জ্বল করে তোলে বাঙালির আত্মপরিচয়।
নতুন বছরকে বরণ করতে ভোর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বর্ণিল আয়োজন। রাজধানীর রমনা বটমূলে সমবেত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় বর্ষবরণের, যা বাঙালির হৃদয়ে বিশেষ আবেগ জাগিয়ে তোলে।
গ্লানি পেছনে ফেলে বাঙালি আজ স্বাগত জানায় এক নতুন সূর্যোদয়কে। ভোরের আলো ফুটতেই লাল-সাদা পোশাকে সেজে ওঠে মানুষ, মুখে থাকে আনন্দের হাসি। রাস্তাঘাট, পার্ক, সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণ—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ।
রাজধানীর রমনা বটমূল থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত একই আনন্দধারা বয়ে যায়। কোথাও ভেসে আসে ‘এসো হে বৈশাখ’-এর সুর, কোথাও আবার বেজে ওঠে ঢোল-করতাল। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মানুষ অংশ নেয় বিভিন্ন উৎসব আয়োজনে।
পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একত্রিত হয়ে এই দিনটি উদযাপন করে। বৈশাখী শোভাযাত্রা, লোকজ মেলা, পান্তা-ইলিশ, গ্রামীণ খেলাধুলা—সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও বর্ণিল।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলা নববর্ষের সূচনা মোগল সম্রাট আকবরের সময়, ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ফসলি সন প্রবর্তনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের উদ্যোগে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর এটি বাঙালির অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়।
একসময় এই উৎসবটি কেবল গ্রামবাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে জড়িত ছিল। বৈশাখ উপলক্ষে হালখাতা খুলে নতুন করে ব্যবসার হিসাব শুরু করা কিংবা পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সেই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে। সময়ের বিবর্তনে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় ও ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে এই উৎসব আরও বিস্তৃত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, আজকের এই পহেলা বৈশাখ হয়ে উঠেছে বাঙালির সবচেয়ে বড় ও সর্বজনীন মিলনমেলা। নতুন বছরে প্রতিটি বাঙালির জীবন হোক আনন্দময় আর সমৃদ্ধ—এই প্রত্যাশাই আজ সবার।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.