‘ডি গ্রেড’ গভর্নরের দেশে যেসব অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দেয়

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্স ম্যাগাজিন প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গভর্নরদের গ্রেডিং করে। গভর্নরদের মূল্যায়ন করা হয় পাঁচ শ্রেণীতে (এ, বি, সি, ডি, এফ)। কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক চূড়ান্ত পর্যায়ে ব্যর্থ হলে সেটির গভর্নরকে ‘এফ’ গ্রেড দেওয়া হয়। অর্থাৎ একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন প্রায় ব্যর্থ হয় তখনই তার গভর্নরকে ‘ডি’ গ্রেডে নামানো হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর যখন ‘ডি’ গ্রেডের হয়, তখন সেই দেশটির অর্থনীতিতে ব্যাপক সমস্যা দেখা দেয়। এই গ্রেডের গভর্নর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে অনেকাংশে ব্যর্থ হয়। মুদ্রার বিনিময় হারের সুরক্ষা দিতেও ব্যর্থ হয়। এছাড়া দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ব্যাপক পতন হয়।

এদিকে ২০২৩ সালে গ্লোবাল ফাইন্যান্স ম্যাগাজিনের গ্রেডিং অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ‘ডি’ গ্রেড পেয়েছিলেন। কারণ প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ সব সূচকে বাংলাদেশের অবনতি হয়েছিলো। আর এসব সূচকের উন্নতি ঘটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোন উদ্যোগ কাজে আসেনি। এরফলে দেশের অর্থনৈতিক খারাপ অবস্থার দায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূল নীতিকেই দিয়ে আসছিলেন অর্থনীতিবিদরা।

গ্লোবাল ফাইন্যান্স ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণে গভর্নরদের মূল্যায়নের মাপকাঠি হিসেবে মোটাদাগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হারের সুরক্ষা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুসংহত করার মতো বিষয়গুলোর কথা উঠে আসে। গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ‘ডি’ গ্রেড পাওয়ার পরেও এসব সূচকের কোনো উন্নতি করতে পারেননি। উল্টো অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

তথ্য বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ১২তম গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। তিনি ২০২২ সালের ১২ জুলাই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৯৭৯ কোটি ডলার। আর গতকাল ১৫ মে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৯০ কোটি ডলার। সে হিসাবে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত রিজার্ভ কমেছে ১ হাজার ৫৮৯ কোটি ডলার।

মূল্যস্ফীতির পারদ চড়তে থাকায় বেশ কিছু দিনে থেকে ভুগছে দেশ। মূল্যস্ফীতি হু হু করে বাড়ায় কষ্টে দিন পার করছেন সাধারণ মানুষ। এপ্রিল মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২২ শতাংশে, যা মার্চ মাসে ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। তবে আলোচ্য এ মাসে কমেছে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার। এরপরেও মূল্যস্ফীতির হার দুই অঙ্কের কাছাকাছি। শহরের তুলনায় গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেড়েছে। এ কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ সীমিত আয়ের মানুষ।

মূল্যস্ফীতি কমাতেও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। তখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। সুদহার বৃদ্ধি করা দেশগুলো বেশ সফলতাও পায়। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো উদ্যোগই নেয়নি। উলটো তখন ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে বেধে রাখে।

দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেছিলেন, ‘বর্তমানে যে মূল্যস্ফীতি, তা বাজারে অতিরিক্ত টাকা সরবরাহের কারণ নয়; বরং অতিরিক্ত আমদানি ব্যয়ের কারণে। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় মাত্রাতিরিক্ত আমদানি ব্যয় মেটানোর কারণেই এই মূল্যস্ফীতি।’

তিনি আরও বলেছিলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কাজ। এক্সচেঞ্জ রেটকে নিয়ন্ত্রণে আনা দ্বিতীয় বড় দায়িত্ব এবং তৃতীয় হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দুই বছর আগে যেসব কাজকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছিলেন, দেশের অর্থনীতিতে এখন সেগুলোই সবচেয়ে বড় সমস্যা। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বিনিময় হারকেও কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এছাড়া রিজার্ভ প্রতিনিয়ত তলানিতে নেমে আসছে।

অর্থসূচক/ মো. সুলাইমান

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.