এনআরবি ব্যাংকের শেয়ার কারসাজিতে জড়িত চেয়ারম্যান

সম্প্রতি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারে আসার অনুমতি পেয়েছে চতুর্থ প্রজন্মের এনআরবি ব্যাংক। তবে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি পারিবারিক ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমান ব্যাংক কোম্পানী আইনের তোয়াক্কা না করে তাঁর পরিবারের লোকজনকে দিয়ে বেনামে শেয়ার ক্রয় করিয়েছেন। আর এসব দুর্নীতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে ধরা পড়েছে। এর আগেও পুঁজিবাজারে শেয়ার কারসাজিকারীদের সুবিধা দিতে গিয়ে বড় অঙ্কের লোকসান করেছিলো এনআরবি ব্যাংক।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোন ব্যক্তি, কোম্পানি বা একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ব্যাংকের শেয়ার কেন্দ্রীভূত করা যাবে না। এছাড়া কোন ব্যক্তি, কোম্পানি বা কোন পরিবারের সদস্যরা একক, যৌথ বা উভয়ভাবে কোন ব্যাংকের শতকরা দশভাগের বেশি শেয়ার ক্রয় করতে পারবে না।

সূত্র জানায়, এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমান নিজ ও স্ত্রীর নামে, ছেলে, ছেলের বউ, চাচা, দুই ভাতিজা ও তাদের স্ত্রীদের নামে শেয়ার কিনেছেন। মাহতাবুর রহমান ও তার পরিবার ব্যাংকটির মোট ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছেন। অথচ ব্যাংক কোম্পানি আইনে কোনো পরিবার একটি ব্যাংকের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে পারবে। অর্থাৎ ব্যাংক কোম্পানি আইন স্পষ্ট লঙ্ঘন করেছেন মাহতাবুর রহমান।

ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমানের ফোনে একাধিকবার কল দিলেও বন্ধ পাওয়া যায়। তাই অর্থসূচকের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা অর্থসূচককে বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই কোনো ব্যাংকের। এমন কোনো বিষয় যদি ধরা পড়ে তদন্তে তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শেয়ার কারসাজির এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও (বিএসইসি) জানানো হবে। কমিশনের আইন অনুযায়ী কমিশন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, তবে কমিশন আইনে সর্বোচ্চ শেয়ার ধারণের বিষয়ে কোনো নিয়ম নেই। আইনে উদ্যোক্তা পরিচালকদের সর্বনিম্ন ৩০ শতাংশ ও পরিচালকদের কমপক্ষে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদি ব্যাংক কোম্পানি আইনের কোনো ব্যতয় হয়ে থাকে তবে বাংলাদেশ ব্যাংক দেখবে।

জানা যায়, মাহতাবুর রহমান নিজে শেয়ার কিনে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের শেয়ার উপহার দেওয়ার মাধ্যমে কয়েকজনকে পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি ব্যাংকটির মোট ৫ কোটি ১১ লাখ ৬২ হাজার শেয়ার কিনেছিলেন। যার মধ্যে থেকে তার স্ত্রী বায়জুন এন চৌধুরীকে ৩০ লাখ ও তার ছেলে এমাদুর রহমানকে ৩০ লাখ শেয়ার উপহার হিসেবে দিয়েছেন। এছাড়া চেয়ারম্যানের ভাই অলিউর রহমানের নামে শেয়ার কিনে ৩০ লাখ শেয়ার উপহার দেন নিজের ছেলেকে।

অপরদিকে মেয়ে মুনিরা রহমান, সামিরা রহমান, জাহরা রহমান ও ভাই অলিউর রহমানকে মোট ২ কোটি ৭২ লাখ ৫০ হাজার শেয়ার উপহার হিসেবে প্রদান করেছেন মাহতাবুর রহমান। এছাড়া নিজ পরিবারের বাইরে ছেলের স্ত্রী ফারহানা রহমানকে ২৫ লাখ, ভাতিজা মোহাম্মাদ আশফাকুর রহমানকে ৫৪ লাখ, ভাতিজা এহসানুর রহমানকে ১ কোটি ৬০ লাখ, আশফাকের স্ত্রী তানজিনা রহমানকে ২০ লাখ ও এহসানের স্ত্রী ড. রাফা জায়গিরদারকে ১ কোটি ৬৫ লাখ ৩৩ হাজার শেয়ার উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়েছে।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র রেজাউল করিম অর্থসূচককে বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের কোন লঙ্ঘন হয়ে থাকলে সেবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিএসইসি’কে যদি এই ব্যাংকটির বিষয়ে কোন পরামর্শ দেয়, সেক্ষেত্রে তদন্ত করে বিএসইসি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সকল শর্ত সঠিকভাবে পূরণ করার কারণে ব্যাংকটিকে পুঁজিবাজারে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ শেয়ারধাণে সিকিউরিটিজ আইনে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। উদ্যোক্তা পরিচালকদের সর্বনিম্ন ৩০ শতাংশ ও পরিচালকদের কমপক্ষে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

জানা যায়, মাহতাবুর রহমান ও তার পরিবারের কাছে মোট ১৪ কোটি ৪২ লাখ ৫৮ হাজার শেয়ার রয়েছে, যা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এরমধ্যে মাহতাবুর রহমান, তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের কাছে রয়েছে ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৭৯ হাজার শেয়ার, যা মোট শেয়ারের ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। এছাড়া ভাই, ভাতিজা ও তাদের স্ত্রীদের কাছে রয়েছে মোট ৮ কোটি ৬ লাখ ৭৯ হাজার শেয়ার, যা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এনআরবি ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা ৫৯ কোটি ৫ লাখ ৮৭ হাজার।

শেয়ার উপহার প্রদানকারী একে অন্যের আত্মীয়। তাছাড়া মাহতাবুর রহমান তার ভাতিজাদের দিয়ে বেনামে শেয়ার কিনেছেন বলেও প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। এ কমিটি আরো বেশকিছু সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ব্যাংকের কাছে চাইলেও ব্যাংক তা বিএফআইইউ’কে প্রদান করেনি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বেনামে শেয়ার কেনার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাতিজা আশফাকুর রহমানের মাধ্যমে ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালক দাতো ইঞ্জিনিয়ার মো. একরামুল হকের কাছ থেকে ১১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ৯০ লাখ শেয়ার ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকায় মোট ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৯১ ডলারে কেনেন। এরমধ্যে রেমিট্যান্স হিসেবে মাহতাবুর রহমান ও তার ছেলে এমাদুর রহমান এনআরবি ব্যাংকে আশফাকুর রহমানের হিসাবে (নং- ১০১২০৩০০৪৩৪৪৫) প্রদান করেন।

এদিকে আরেক ভাতিজা এহসানুর রহমানের নামে ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালক উদ্দিন আহমেদ আফসারের কাছ থেকে ১৬ টাকা দরে ২৯ লাখ ১৬ হাজার শেয়ার কেনা হয় মোট ৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকায়। এ টাকাও মাহতাবুর রহমান তার ভাতিজা এহসানুর রহমানের এনআরবি ব্যাংকের হিসাবে (নং- ৩০১২০৩০০৯০২৫৩) ২ লাখ ৫১ হাজার ৪৬৭ ব্রিটিশ পাউন্ড দিয়ে পরিশোধ করেন।

এছাড়াও ব্যাংকটির চেয়ারম্যান বেনামে আরো কত শেয়ার কিনেছেন তা জানতে চেয়ে কাগজপত্র চাইলেও এনআরবি ব্যাংক বিএফআইইউকে দেয়নি। তাই আরো কত শেয়ার বেনামে কিনেছেন চেয়ারম্যান তা জানতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এর ফলে বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) তথ্য প্রদান না করার অভিযোগ করা হয়েছে।

অর্থসূচক/ মো. সুলাইমান

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.