সংসদে ‘ঘুমিয়ে ও গল্প করে’ সময় পার করেন এমপিরা: টিআইবি

জাতীয় সংসদে জনগণের কোটি টাকা খরচ করে ‘ঘুমিয়ে ও গল্প করে’ সময় পার করেন এমপিরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

টিআইবি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নের আলোচনায় সংসদ সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ঘাটতি লক্ষণীয় ছিল। অধিবেশন চলাকালে সংসদ সদস্যদের অমনোযোগী দেখা গেছে। এমনকি এ সময় সংসদ সদস্যদের মোবাইল ফোন ব্যবহার, নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতা, ঘুমাতেও দেখা গেছে।

আজ রোববার টিআইবি প্রকাশিত ‘একাদশ জাতীয় সংসদের ১ম থেকে ২২তম অধিবেশন (জানুয়ারি ২০১৯-এপ্রিল ২০২৩)’ গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ২২ অধিবেশনে কোরাম সংকটে মোট ৫৪ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। যার অর্থমূল্য প্রায় ৮৯ কোটি ২৪ লাখ ৮ হাজার ৭৭৯ টাকা। কোরাম সংকটে ব্যয় করা সময়ের মিনিট প্রতি ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কোরাম সংকটে শুরুতে ৮৪ ভাগ অধিবেশন দেরিতে শুরু হয়েছে। বিরতির পর শতভাগ বিলম্বে শুরু হয়েছে আরও বেশি। আমাদের অধিবেশন শুরু করার জন্য মাত্র ৬৫ জন সংসদ সদস্য লাগে। ৩৫০ জনের মধ্যে ৬৫ জন সংসদ সদস্য যথাসময়ে উপস্থিত হতে পারবেন না, এটা হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদের প্রত্যাশিত কার্যকর ভূমিকা পালনের ঘাটতি দেখা গেছে। এই ঘাটতির অন্যতম কারণ হচ্ছে কার্যকর বিরোধী দল বলতে যা বোঝায় তার উপস্থিতি সংসদে ছিল বলা যায় না। এ কারণেই সংসদ মূলত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ক্ষমতাসীনদের সংসদে একচ্ছত্র ভূমিকা পালন করতে দেখেছি।’

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী মাসে অন্তত একটি সংসদীয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেটি একটি কমিটিও পূরণ করতে পারেনি।

সংসদ কার্যকর করতে হলে অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার জন্য সমান সুযোগ রেখে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সত্যিকার অর্থে প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারদলীয় সদস্যদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট ব্যয় করা সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ সময় ব্যয় হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসায় ১৯.৮ শতাংশ। সরকারের বিভিন্ন অর্জনের প্রশংসায় ১৯.৪ শতাংশ সময় ব্যয় হয়েছে। প্রায় ১৮ শতাংশ সময় ব্যয় করেছেন অন্য দলের সমালোচনায়। আর অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন ০.৪ শতাংশ সময়।

এ দিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব আলোচনায় মোট ব্যয় করা সময় ১৮৬ ঘণ্টা ২৬ মিনিট। যা সংসদ কার্যক্রমের মোট ব্যয় করা সময়ের ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারি দলের সদস্যদের ব্যয় করা সময় মোট ১৫৬ ঘণ্টা ২৮ মিনিট (৮৬.২%), প্রধান বিরোধী দলের ব্যয় করা সময় ২০ ঘণ্টা ১৮ মিনিট (১১.২%) এবং অন্যান্য বিরোধী দলের ব্যয় করা সময় ৪ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট (২.৬%)।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে মোট ১২৪ ঘণ্টা ১৮ মিনিট সময় ব্যয় হয় যা সংসদ কার্যক্রমের ব্যয় করা সময়ের প্রায় ১৬.৭ শতাংশ। এখানে উল্লেখ্য, ২০১৯-২০-এ যুক্তরাজ্যে এই হার ছিল প্রায় ৪৯.৩ শতাংশ এবং ২০১৮-১৯-এ ভারতের ১৭তম লোকসভায় এই হার ছিল ৪৫.০ শতাংশ।

এতে আরও বলা হয়, বাজেট সম্পর্কিত ১২টি বিল ব্যতীত মোট উত্থাপিত বিলের সংখ্যা ১০৮টি (সরকারি বিল ১০৭টি এবং বেসরকারি বিল ১টি) এবং পাসকৃত বিলের সংখ্যা ১৬টি (নতুন বিল ৬৮, সংশোধনী বিল ২৬টি এবং রহিতকরণ বিল ২টি)। সংসদে একটি বিল পাস করতে গড়ে সময় লেগেছে প্রায় ৭০ মিনিট; যেখানে সর্বনিম্ন সময় ছিল প্রায় ২৮ মিনিট এবং সর্বোচ্চ সময় ছিল প্রায় ৩ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। সর্বনিম্ন সময়ে পাসকৃত বিলটি ছিল ‘ভোটার তালিকা (সংশোধন) বিল, ২০২০’ সর্বোচ্চ সময়ে পাসকৃত বিলটি ছিল ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল, ২০২২’।

জাতীয় সংসদের প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন নিশ্চিতে ১৩ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে—জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাস্তবিক অর্থে অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা ও বিরোধী দলের শক্তিশালী ভূমিকা পালন নিশ্চিত করা; সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের জন্য সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা; সরকারি দলের একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা; সংসদ সদস্যদের আচরণ ও কার্যক্রম সম্পর্কে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুসারে ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’ প্রণয়ন করা; সংসদে অধিকতর শৃঙ্খলা রক্ষাসহ অসংসদীয় ভাষার ব্যবহার বন্ধে স্পিকারকে জোরালো ভূমিকা নেওয়া; অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা এবং অহেতুক প্রশংসা ও সমালোচনা না করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে কার্যকর অংশগ্রহণ ও ফলপ্রসূ আলোচনা নিশ্চিত করতে দলীয় প্রধান ও হুইপের জোরালো ভূমিকা পালন করা ইত্যাদি।

অর্থসূচক/এমএস

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.