জাতিসংঘ-ইইউ, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের প্রতিনিধিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর

উন্নয়নমূলক উদ্যোগ প্রত্যক্ষ করতে পার্বত্য চট্টগ্রামেসফর করেছে জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদারের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে সপ্তাহব্যাপী এই সফর ১৩ নভেম্বর শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ১৭ নভেম্বর।

প্রতিনিধি দলের সদস্যরা হলেন- বাংলাদেশে জাতিসংঘের নবনিযুক্ত আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস, ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাষ্ট্রদূত চার্লস হুইটলি, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এসপেন রিকটার-স্ভেন্ডসেন, বাংলাদেশে জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর প্রধান- ইউএনডিপি আবাসিক সমন্বয়কারী স্টেফান লিলার, ইউএনএফপি কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ক্রিস্টিন ব্লোখুস, এফএও কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রবার্ট সিম্পসন এবং ইউনিসেফ কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ শেল্ডন ইয়েট।

জাতিসংঘ আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন কাজ ব্যাপকভাবে সফল হয়েছে। তবে সেবাপ্রাপ্তি পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া এবং প্রত্যন্ত এলাকায় অনেক জনগোষ্ঠীর বসবাস হওয়া চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা বনাঞ্চল ও তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে অসাধারণ কাজ করে চলেছেন। জলবায়ু পরিবর্তন তাদের কাজকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।’

তিনি আরও বলেন, এই সফরের ফলে ওই এলাকা সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ ধারণা পাওয়ার সুযোগ হয়েছে, সেখানকার নারী ও কিশোরীদের কথা শোনার এবং বিভিন্ন কর্মসূচি পরিদর্শন করতে পেরেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্তর্ভূক্তিমূলক পদ্ধতিতে এবং এজেন্ডা ২০৩০-এর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাউকে পেছনে না ফেলে সমন্বিত, কার্যকর ও টেকসই উন্নয়নের জন্য জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় ও অংশীদারদের সমর্থন জরুরি।

ইইউ রাষ্ট্রদূত চার্লস হুইটলি বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই অঞ্চলে জাতিসংঘের উন্নয়ন কার্যক্রমের দৃঢ় সমর্থক। আমরা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মর্যাদা ও সমতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় তাদের প্রথাগত নেতৃত্ব বজায় রেখে তাদের শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গঠন করতে চাই।’

যুক্তরাজ্যের দূত রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে এটি আমার তৃতীয় সফর। এই অঞ্চলে উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো সবসময় আমাদের ভাবায় এবং এখানে টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে সরকার, জাতিসংঘ, উন্নয়ন অংশীদার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকায় পানি সরবরাহে ভিলেজ কমন ফরেস্টস-এর সুফল দেখে আমি বিশেষভাবে অভীভূত এবং প্রত্যাশা করছি যে এই বন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আরও সম্প্রসারিত হবে, যাতে সবাই এর সুফল পেতে পারে।’

নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এসপেন রিকটার-স্ভেন্ডসেন বলেন, ‘জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রগুলোর একটি এবং জাতিসংঘ সংস্থাগুলো বড় সহযোগী হিসেবে শান্তি, সমতা ও সংহতির প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি প্রশ্নাতীত। আমি পার্বত্য এই এলাকায় আমাদের অংশীদারীত্ব প্রত্যক্ষ করতেই আবার সফর করতে চেয়েছিলাম।’

দূতেরা খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ডেপুটি কমিশনার, মং ও চাকমা সার্কেল প্রধান, নারী নেত্রী, পরিবেশবাদী এনজিও এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিদর্শনকালে প্রতিনিধি দল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের কথা, তাদের চ্যালেঞ্জগুলো এবং সুপারিশগুলো শুনেছেন।

বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিন সমন্বয়কারী স্টেফান লিলার বলেন, ‘আমরা বন সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পরিষ্কার পানি সরবরাহে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে পানির ঘাটতির সমস্যা চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর অনেক সমস্যা রয়েছে- শিক্ষার ঘাটতি, স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাপন ও পানির সমস্যা রয়েছে। এখন জলবায়ু পরিবর্তন এসব সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর থেকেই আমরা পার্বত্য এলাকায় কাজ করছি এবং আমরা এখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো অব্যাহত রাখব।’

বাংলাদেশে ইউনিসেফ কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ শেল্ডন ইয়ট বলেন, ‘শিশুদের নিয়ে চিন্তা অবশ্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদের কাজের কেন্দ্রে থাকতে হবে। আজ ও আগামীতে শিশুর ভালো থাকার জন্য বিনিয়োগ কেবল সঠিক কাজই নয়, এটি বাংলাদেশের সবাইকে উপকৃত করবে।’

ইউএনএফপিএর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ক্রিস্টিন ব্লোখুস বলেন, প্রত্যন্ত হওয়ায় এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের নারীরা গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রতিটা গর্ভধারণ প্রত্যাশিত এবং প্রতিটা শিশুর জন্ম নিরাপদ করতে প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকারের বিষয়ে জাতিসংঘের নেতৃত্ব দানকারী সংস্থা ইউএনএফপিএ প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্য এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা রুখতে সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। এসব সহযোগিতার মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ধাত্রী ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ কর্মী সরবরাহ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সংযোগ ঘটানো অন্যতম।

বাংলাদেশে এফএও কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. রবার্ট সিম্পসন পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে কৃষি ও উন্নয়নে এর সম্ভাবনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী সিংহভাগ মানুষ জীবনযাপন, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চলে কফি, আম ও আনারসের মতো উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনে সম্ভাবনা রয়েছে, যা আয় বৃদ্ধি করবে। তবে সমহারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে উন্নয়নকে অবশ্যই ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে।’

কাউকে পেছনে ফেলে না রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই, অভিযোজিত, অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ১৭ নভেম্বর প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সফর শেষ করেন।

অর্থসূচক/এএইচআর

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
মন্তব্য
Loading...