খুলনার চুইঝালের কদর এখন দেশজুড়ে

0
224

খুলনা অঞ্চলের চুইঝাল সারাদেশেই বিখ্যাত। আর তাই যেনো চুইঝাল ছাড়া দিন চলে না খুলনাবাসীর। খাবারের মেন্যুতে কোনো না কোনো ভাবে চুই থাকা চাই। আমাদের দেশে ঝাল স্বাদের মশলাজাতীয় এ খাবারটির উৎপত্তি বাগেরহাটে বলে মনে করা হয়। লতা জাতীয় এই গাছ এখন বেশকিছু জায়গায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে। যে কারণে খুলনার চুইঝালের কদর এখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

চুইঝাল বাংলাদেশের একটি অপ্রচলিত মশলা। দেশের পশ্চিমাঞ্চলের বিশেষ করে খুলনা বাঘেরহাট পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, বরিশাল, ফরিদপুরে চুই গাছ পাওয়া যায়।

চুই গাছ দেখতে পান গাছের মতো। পাতা কিছুটা লম্বা ও পুরু। চুইঝালের নিজস্ব স্বাদ ও ঘ্রাণ আছে।। রান্নায় মশলা হিসেবে খাওয়া হয়।

চুই দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় প্রজাতি। এটি ভারত এবং এশিয়ার উঁচু স্থানে পাওয়া যায়। সেই সাথে মালায়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলংঙ্কায় পাওয়া যায়। এক সাময় বাংলাদেশের উঁচু স্থানের সর্বত্র পাওয়া যেতো। বর্তমানে এর বিস্তার কমে এসেছে।

চুই গাছের কান্ডের আকার বেশ মোটা ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার। চুই পাতা ২ থেকে ৩ ইঞ্চি লম্বা হয়। চুই পাতা দেখতে অনেকটা গোল মরিচের পাতা বা পান পাতার মতো। চুই গাছ ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় গাছ দীর্ঘদিন পর্যন্ত টিকে থাকে।

উঁচু জায়গায় বিশেষ করে বেলে দোআঁশ মাটিতে ভালো হয় তবে বেশি বালি ও লবণাক্ত মাটিতে চুই বাঁচে না । এমন কি চলাবদ্ধ পরিবেশে চুই মারা যায়। সাধারণত যে জাতটি লতা জাতীয় সেটি আম, সেগুন, মেহগুনি কাঁঠালসহ উঁচু গাছে গোড়ায় লাগিয়ে দিলে গাছ বেয়ে উঠতে থাকে। অনেক দিন গাছের ক্ষতি না করেই বেঁচে থাকে। উঁচু জমিতে ভালো হয় তবে ফল বা বৃক্ষের ছায়া যুক্ত বাগানে চুই চাষের জন্য উপযোগী। বর্তমানে দেশের সাতক্ষীরা, খুলনা যশোরের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিক ভাবে চুই চাষ করা হচ্ছে।

চুই গাছের এক লাইন থেকে অন্য লাইনের দূরত্ব ৩ মিটার এবং গাছের দূরত্ব ২ মিটার রাখতে হবে। চারা লাগানোর পূর্বে গর্তে জৈব সার দিয়ে মাটি তৈরি করে নিতে হবে এবং ৭ দিন পর চারা লাগাতে হবে।

গাছের গোড়া থেকে ১২-১৫ ইঞ্চি দূরে গর্ত করে চুই গাছের কাটিং লাগাতে হবে। গর্তে কিছু গোবরসহ ইউরিয়া ৫০ গ্রাম টি এস টি ৫০ গ্রাম পটাশ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে ৭ দিন রেখে দিতে হবে।

তবে চুইয়ের লতা লাগানোর আদর্শ সময় আশ্বিন-কার্তিক মাস। চুই গাছে তেমন পানির সেচ দেওয়া লাগে না। কিন্তু চৈত্র মাসে পানি দেওয়া লাগতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে গোড়া উঁচু করে দেওয়া লাগে।

তবে রাসায়নিক সারের ব্যবহার নেই বলা চলে। অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে গাছ মারা যায়। তবে গোড়ার মাটি নরম রাখলেই ভালো হয়। ফলে গাছের শিকড় মোটা হতে পারে। গাছ যখন লতানো শুরু করবে তখন, অন্য কোন গাছ বা মাচায় তুলে দিতে হবে।

এক বছরের মাথায় চুই খাওয়ার উপযোগী হয়। তবে ভালো ফলনের জন্য ৫/৬ বছরের রাখলে ভালো হয়। এর পাতা ছাড়া সব খাওয়া যায়। তবে শিখড়ের অংশ বেশি ঝাল এবং সুগন্ধ যুক্ত। হেক্টর পতি ২ থেকে ২.৫ টন ফলন পাওয় যায়। তবে দুই বছর বয়সের গাছে থেকে ভালো মানের চুইঝাল পাওয়া যায়। ৫ বছর রাখলে একটি গাছ থেকে ২৫-৩০ কেজি ঝালা পাওয়া সম্ভব।

চুইঝাল বাজারে মূলত শুকনা এবং কাঁচা উভয় অবস্থায় বিক্রি হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি চুই ঝালের বাজার মূল্য ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। শিকড়ের অংশের দাম বেশি। পাইকারি বাজারে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। শুকনা অবস্থা ৪ হাজারে উপরে দাম থাকে। তবে বর্তমানে বিদেশ থেকে চুই অমদানি করা হয়।

চুই ঝালের ঔষধি গুণ:
১. পেটের পিড়ার জন্য ব্যবহার করা হয়।
২. খাবারের রুচি ফেরাতে ভূমিকা রাখে।
৩. ঘুমের ঔষধ হিসেবে প্রসিদ্ধ।
৪. শরীরের ব্যাথা কমাতে কাজে লাগে।
৫. বমি ও শ্বাসকষ্ট রোধে কাজ করে।

বর্তমানে দেশের বেশ কিছু নার্সারিতে, বাণিজ্যিকভাবে চুইঝালের চারা চাষ করছে। খুনলার ডুমুরিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর সহযোগিতাই। আশপাশের বেশ কিছু নার্সারি চারা তৈরি করে সারাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

অর্থসূচক/আরএস/এমএস