মাত্র একজনের মৃত্যু হলে হারিয়ে যাবে যে ভাষা

মানুষের মনের ভাব আদান প্রদানের অন্যতম মাধ্যম ভাষা। বিচিত্র সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যে ভরপুর এই পৃথিবীতে ভাষা আছে সাত হাজারেরও বেশি। তবে এগুলোর মধ্যে অল্প কিছু ভাষায় নিজের ভাবের আদান প্রদান করেন পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ। প্রায় সাতশ আশি কোটির মধ্যে ১৫০ কোটির বেশি মানুষ কথা বলেন মাত্র তিনটি ভাষায়- মান্দারিন, স্প্যানিশ ও ইংরেজি।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভাষাবৈচিত্র্য দেখা যায় আফ্রিকা ও এশিয়ায়, যেখানে ২০০০ এরও বেশি ভাষায় কথা বলে মানুষ। মানচিত্রের আরেক পাশ ইউরোপে ২৫০টি ভাষা ও উপভাষায় কথা বলে মানুষ।

একটি গবেষণায় জানা গেছে, পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ মানুষ মাত্র ১২টি ভাষায় কথা বলে। কিন্তু সেই অল্প কিছু মানুষ যে ভাষায় কথা বলে সে ভাষাগুলোই তাদের সংস্কৃতিকে ভিন্নভাবে পৃথিবীর বুকে তুলে ধরছে। ৯৬ শতাংশ ভাষায় কথা বলেন মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ মানুষ। সাত হাজার ভাষার মধ্যে দুই হাজার ভাষায় কথা বলেন মাত্র এক হাজার মানুষ।

পৃথিবীর এই ভাষাবৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে অন্যতম একটি প্রকল্প অ্যাথনোলগ ডাটাবেজ। এই ডাটাবেজে এখনো পর্যন্ত ৭ হাজার ৯৯টি ভাষা তালিকাভুক্ত করেছে।

আবার জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অব হিউম্যান হিস্ট্রি এর গ্লোটোলগে ভাষার আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। গ্লোটোলগে ৮ হাজার ৫০০টি ভাষা তালিকাভুক্ত হয়েছে। ভাষার বিস্তারিত তথ্যের পাশাপাশি এই ডাটাবেজে ভাষার উৎস, শ্রেণী এবং তাদের উপভাষা নিয়ে প্রাথমিক ভৌগলিক তথ্য পাওয়া যায়।

বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় এবং ভাষাগত বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণে কাজ করে ইউনেস্কোর অ্যাটলাস অব ওয়ার্ল্ড’স ল্যাঙ্গুয়েজ ইন ডেঞ্জার। এটি শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যেই ১১টি বিপন্ন ভাষা তালিকাভুক্ত করেছে। ইউরোপের ১৪টি ভাষার মধ্যে দুটি ভাষা অতিবিপন্ন অবস্থায় আছে। এগুলো হলো কর্নিশ ও ম্যানএক্স। একমাত্র পুনরুদ্ধারের উদ্যোগই এই দুটি ভাষাকে বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।

হ্যান্ডবুক অব এনডেঞ্জারড ল্যাঙ্গুয়েজ এর লেখকরা মনে করেন, পৃথিবীর ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ ভাষা এই শতাব্দীতেই বিলুপ্ত হতে পারে। প্রথম ধাপে ৫০০ ভাষা বিলুপ্ত হতে পারে যা এখন অনেক জায়গায় বিলুপ্তপ্রায়। কিছু কিছু ভাষা খুব কম মানুষ এমনকি একজনকেও একটি ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়।

ক্যামেরুনের বিলুপ্তপ্রায় একটি ভাষা বিস্যু। দেশটির উত্তর পশ্চিম প্রদেশ, মেনচাম বিভাগ, ফুরু-আভা মহকুমাসহ কয়েকটি গ্রামে প্রচলিত ছিল এই ভাষাটি। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী এই ভাষার মাত্র একজন স্থানীয় ব্যক্তি পাওয়া গেছে। যিনি মারা গেলে হয়তো এটিও বিলুপ্ত ভাষার তালিকায় স্থান পাবে।

উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় বিলুপ্ত বেশ কিছু ভাষা পাওয়া গেছে, আবার এমন কিছু ভাষা আছে যা এখন বিলুপ্ত। যেমন ১৯৯০ সালের গণনা অনুযায়ী ক্ল্যালাম ভাষায় কথা বলতেন মাত্র পাঁচজন। ২০১৪ সালে ওই ভাষায় কথা বলা শেষ ব্যক্তি মারা গেলে এই ভাষাটিকে বিলুপ্ত বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।

এ ধরনের বিলুপ্তপ্রায় ভাষা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে কাজ করছে এনডেঞ্জারড লেঙ্গুয়েজ প্রজেক্টসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্প। এই ধরনের প্রকল্পগুলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই ভাষাগুলোকে সংরক্ষণের কাজ করছে।

অর্থসূচক/কেএসআর

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.