রেসের পুরস্কার ভাষা শহীদদের উৎসর্গ করলেন অভিক

নিজস্ব প্রতিবেদক

0
236

হাতে স্টেয়ারিং নিয়ে পায়ের চাপে ঝর উঠে যায় পথে! এভাবেই একজনকে পেছনে ফেলে অন্যজনের লক্ষে পৌঁছবার চেষ্টা। জ্বি ঠিকই ভেবেছেন, বলছি গাড়ির রেসের কথা। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এ খেলায় যেন রোমাঞ্চের কোনো শেষ নেই। স্পোর্টস চ্যানেল গুলোতে প্রায়ই দেখা মেলে রেসিং গেমের। আমাদের দেশের জনসাধারণের কাছে এই খেলাটা বিদেশিদের খেলা হিসেবেই পরিচিত। হবেই না কেন? দেশে রেসিং ট্রেক, ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস ইত্যাদি খেলাসমূহের প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা থাকলেও নেই রেসিং এর জন্য কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। তাই বাংলাদেশ থেকে রেসিং দুনিয়ায় ক্যারিয়ার গড়ে তোলা যেন অসম্ভব ব্যাপার। তবে এখনও অনেকের কাছেই অজানা যে আন্তর্জাতিক রেসের ট্র্যাক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এক বাংলাদেশি তরুণ। জ্বি! বলছি অভিক আনোয়ারের কথা।

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আন্তর্জাতিক মোটর স্পোর্টস ইভেন্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের রেকর্ড করেছেন অভিক আনোয়ার। বাংলাদেশের ‘ র‍্যালি ক্রস চ্যাম্পিয়নশিপ’ বিজয়ী হয়েছিলেন তিনবার। তারপরই নাম লিখিয়েছিলেন ভারতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মোটর স্পোর্টস ইভেন্ট ‘দ্য ভক্সওয়াগন অ্যামিও কাপ’-এ। যা ভিডব্লিউ ভেন্টো কাপ নামেও পরিচিত।

দক্ষতা, নৈপুণ্য আর গতির প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মতো বিজয়ী এই বাংলাদেশি কার রেসার অভিক আনোয়ার আবারও পডিয়াম জয় করেছেন! এবার তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অবস্থিত “ইয়াএস মেরিনা ফর্মুলা-১ ট্র্যাক” তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন। অভিক আনোয়ার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে, বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের জন্য এই পুরস্কারটি উৎসর্গ করেছেন।

রেসার অভিক আনোয়ার বলেন, ‘আমার সর্বশেষ রেসটা খুবই কঠিন ছিল। সেকেন্ড যে কোয়ালিফাই করেছিলো তার আমার সময়ের ব্যবধান ছিল এক সেকেন্ডেরও কম। অন্যান্য দেশের রেসাররা আমাকে দেখে অবাক হয়। বাংলাদেশ থেকে এসে একজন রেস ট্র্যাক ছাড়া রেস জিতছে, এটা কিভাবে সম্ভব।’ স্বপ্ন জয়ে অভিকের ছিলো পদে পদে বাধা। ফর্মুলা থ্রির লাইসেন্স থাকলেও বাংলাদেশে অনুশীলনের কোন রেসিং ট্র্যাক না থাকায় প্লে স্টেশনের গেম আর সিমুলেটরই তার ভরসা। এগিয়ে আসতে বললেন পৃষ্ঠপোষকদেরও।

বাবা আনোয়ার হোসেনের গাড়ির ব্যবসা। ছোটবেলা থেকেই নানা ব্র্যান্ডের গাড়ি দেখে বড় হয়েছেন। প্রায়ই বাবার দোকানে গিয়ে গাড়ি ছুঁয়ে দেখতেন। তখনই শখ জাগে গাড়ি নিয়ে ভিন্ন কিছু করার। এরপর বাবাকে না জানিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে গাড়ি চালনা শেখেন। ওই সময় টিভিতে দেখতেন ফর্মুলা ওয়ান রেসিং। চোখের নিমেষে বিশ্বখ্যাত রেসার মাইকেল শুমাখার, মিকা হাকিনেনদের ছুটে চলা দেখতেন। তাদের দেখেই একদিন স্বপ্ন জাগে গাড়িতে গতির ঝড় তোলার।

প্লে স্টেশনের গেম আর সিমুলেটর ছিল ভরসা। প্লে স্টেশনে খেলতেন গ্রান ট্যুরিসমো স্পোর্ট। বন্ধুরা প্রায়ই হাসাহাসি করতেন আর বলতেন, ‘এসব অবাস্তব গেম খেলে কী হবে?’ বন্ধুদের বোঝাতেই পারতেন না যে এই খেলার সঙ্গে বাস্তবে গাড়ি চালানোর কতটা মিল রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালে কানাডায় উচ্চতর পড়াশোনার জন্য গেলে সেখানেই মেলে অনুশীলনের সুযোগ। কানাডায় পড়াশোনার ফাঁকে কাজ করতেন পিৎজা সরবরাহের। কখনো রেস্তোরাঁর সবজি কেটেছেন, কখনো লাইব্রেরিতে করেছেন খণ্ডকালীন চাকরি। এসব কাজ করে জমানো টাকা দিয়ে গাড়ি কেনেন। কানাডার অনুশীলন ট্র্যাকে গিয়ে নিয়মিত চর্চা করতেন। অনুশীলন করতে করতেই কার রেসিংয়ে নিজের সম্ভাবনাও আঁচ করেন অভিক। এরপর ২০১২ সালে পড়াশোনা শেষে ফিরে আসেন ঢাকায়।

দেশে একেবারে অপ্রচলিত খেলা ফর্মুলা রেসিং। কিন্তু এই খেলাতেও সম্ভাবনা দেখেন অভিক, ‘এটা সত্যি যে আমাদের দেশে কোনো অবকাঠামো নেই। এই দেশে দারিদ্র্যের হার বেশি। মানুষ হয়তো চিন্তা করবে, যেখানে অনেকে খেতে পাচ্ছে না, সেখানে রেস করছে। এটা নেতিবাচক দিক। কিন্তু ইতিবাচক দিক হলো যদি সত্যিই খেলার সুযোগ থাকে, তাহলে অনেক যুবক নেশায় জড়াবে না। কারণ, আমি জানি, গাড়ির প্রতি তরুণদের অনেক মায়া। গাড়ির প্রতি তখন টাকা খরচ করবে। ড্রাগসের দিকে ঝুঁকবে না। রেস করলে রাস্তায় জোরে চালানোর প্রবণতাও কমবে। চিন্তা করবে, জোরে গাড়ি চালিয়ে তো কিছু পাচ্ছি না। কিন্তু রেসে গাড়ি চালিয়ে পুরস্কার তো পাবো। তখন জোরে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেবে এমনিতেই।’ অভিক  জানান, মালয়েশিয়ায় পদক জেতার পর যেন ঘোরলাগা জগতে ছিলাম, ‘আমার তো শুরুতে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। অনেক পরে বিশ্বাস হলো, আমি পেরেছি। নিজেকে নিজেই বললাম, দুই বছর পর অবশেষে স্বপ্ন সত্যি হলো।’

অভিকের হাতে শুরু বাংলাদেশের ফর্মুলা ওয়ান ট্র্যাকের পথচলা। কে জানে হয়তো একদিন ফর্মুলা ওয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে উড়বে লাল-সবুজের পতাকা। জীবনটাই তো গতির, এখানে থেমে থাকার কিছু নেই। অভিক যেন সেই গতিরই প্রতীক, থেমে থাকতে চান না। ছুটতে চান আরও সামনে।

রেসের অভিক আনোয়ার আরও বলেন, ‘পুরো একটা সিজন করতে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা লাগে। কিছু স্পন্সর থেকে আসে তবুও ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নিজ পকেট থেকে দিতে হয়। স্বাভাবিকভাবে কেউ যখন ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নিজের পকেট থেকে দিবে তখন একজন চিন্তা করতে পারে এতো টাকা দিয়ে আমি রেস কেন করবো, এই টাকা দিয়ে ভালো কিছু কিনতে পারি। এজন্য সরকারের উচিৎ এই জায়গায় একটু নজর দেয়া। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমি লেমান্স চ্যাম্পিয়নশিপও জেতার চেষ্টা করবো।’

চলতি মাসেই এসি প্রো চ্যাম্পিয়নশিপ রাউন্ড ফোর (AC PRO CHAMPIONSHIP ROUND 4) খেলবেন অভিক। সাফল্যের সৌরভ সেখানেও ছড়িয়ে দেয়ার সংকল্প বাংলার এই গতি তারকার।

অর্থসূচক/এমআর/এমএস