রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে চীন। দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্বকে অভিন্ন সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেছে।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং বলেন, ‘ইতিহাসের এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা বাংলাদেশের সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে, বন্ধুত্ব এগিয়ে নিতে, ঐকমত্য গড়ে তুলতে এবং পারস্পরিক বিনিময় ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ আরও গভীর করতে প্রস্তুত।’
আজ ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে সফররত চীনা নেতা দুই দেশের ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্বকে ভবিষ্যৎ অগ্রগতির চালিকাশক্তিতে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
‘ইতিহাস যেভাবে ভবিষ্যৎকে আলোকিত করে: বাংলাদেশ-চীন ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ প্লাস’ গোলটেবিল বৈঠক ও বাংলাদেশ-চীন দলীয় ও রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা অধ্যয়ন কেন্দ্রের উদ্বোধন’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজন করে ঢাকায় চীনা দূতাবাস। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ঢাকায় চীনা দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউইন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ, পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে লিউ বলেন, প্রায় ৪৬ বছর আগে তাঁর বাবা বাংলাদেশে চীনের দ্বিতীয় রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি শৈশবে আড়াই বছর ঢাকায় ছিলেন। দীর্ঘ ৪৬ বছর পর আজ এখানে এসে অনেক পুরোনো চীনা বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে, যাঁরা আমার বাবাকে গভীর ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করেন। বিষয়টি আমাকে সত্যিই গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
লিউ বলেন, বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতা ও উষ্ণতা এবং দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের সমর্থন তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। তিনি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি হিসেবে ঐতিহাসিক আস্থা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্প্রসারিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ক্রমবর্ধমান সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, পারস্পরিক কল্যাণমূলক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি উভয় দেশ নিজ নিজ সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিক সম্প্রসারণের কথা তুলে ধরে চীনা নেতা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চীনের সহায়তায় বাস্তবায়িত মহাসড়ক, সেতু ও টানেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। ভবিষ্যৎ সহযোগিতার প্রসঙ্গে লিউ মোংলা বন্দর শিল্পপার্ক এবং তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এসব প্রকল্প আরও সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সুফল অর্জনের সুযোগ তৈরি করছে।
লিউ বলেন, চীন তার অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমানের পণ্য আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগও নিচ্ছে।
চীনের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে লিউ বলেন, দেশটির মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১৩ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আগামী দশকে এ পরিমাণ দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে চীনের।
তিনি আরও বলেন, চীনের মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠী ৪০ কোটি থেকে ৮০ কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ২০৪৯ সালের মধ্যে একটি আধুনিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
রাজনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে লিউ বলেন, শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং দল গঠনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগ আরও জোরদার করতে আগ্রহী চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)।
সিপিসির সাম্প্রতিক পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিশেষ করে দল পরিচালনা ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে চীন তার অভিজ্ঞতা ও নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি ভাগ করে নিতে প্রস্তুত। পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের ফলাফল, বিশেষ করে দল গঠন বিষয়ে শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় জোরদার করতে আমরা প্রস্তুত। লিউ সরকারে-সরকারে সহযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক দল, তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৌদ্ধ পণ্ডিত হিউয়েন সাং ও অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের ঐতিহাসিক যাত্রার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময় দুই দেশের জনগণের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। তিনি বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের নয়টি সেতুর কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব সেতু দুই দেশের ক্রমবিকাশমান অংশীদারত্বের দৃশ্যমান প্রতীক।
ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, একতরফাবাদ ও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে লিউ বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও চীনের একযোগে কাজ করে যাওয়া উচিত। পূর্ববর্তী প্রজন্মের নেতাদের গড়ে তোলা বন্ধুত্ব সংরক্ষণ ও আরও শক্তিশালী করতে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি।
লিউ বলেন, ‘ইতিহাস আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তৃত এক মূল্যবান বন্ধুত্বের উত্তরাধিকার দিয়েছে।’ বর্তমানকে বুঝতে হলে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হয়– একটি চায়না প্রবাদ উল্লেখ করে তিনি এ কথা বলেন।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে লিউ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে চীনের আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন ও বাংলাদেশ সব সময় একে অপরের পাশে থাকবে এবং বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ করবে।’ দুই দেশের জনগণের মধ্যে টেকসই সহযোগিতা ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব আরও শক্তিশালী হবে-এ আশাবাদ ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন চীনা নেতা। বাসস



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.