প্রবৃদ্ধি বাড়লেও আর্জেন্টিনা-শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ছে জনঅসন্তোষ

আর্জেন্টিনা, শ্রীলঙ্কা, মরক্কো ও নাইজেরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন উদীয়মান অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়লেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব ও আয়বৈষম্যের চাপে বাড়ছে জনঅসন্তোষ। অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় বিভিন্ন দেশে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে এবং সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা এসেছে। কিন্তু এসব অর্জনের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সমানভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। ফলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে।

আর্জেন্টিনায় প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেইয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৩০০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে। আমদানি বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে এবং ভর্তুকিও কমানো হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়লেও ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি ও ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় চাপে রয়েছেন সাধারণ মানুষ।

মরক্কোয় বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো ও সুউচ্চ ভবন নির্মিত হচ্ছে। তবে বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকট ও ঋণখেলাপির পরিস্থিতি অনেকটা কাটলেও দারিদ্র্যের হার এখনো সংকট-পূর্ব পর্যায়ের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে, নাইজেরিয়ায় জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহারের পর জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, করোনাভাইরাস মহামারি এবং রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে অনেক দেশ সরকারি ব্যয় কমানো, বিনিময় হার উদারীকরণ ও ভর্তুকি প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরাতে সহায়তা করলেও স্বল্পমেয়াদে সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়িয়েছে এবং আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি করেছে।

ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের বিশ্লেষক টরবিয়র্ন সল্টভেডের সতর্ক করে বলেছেন, খাদ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচ মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে অনুভব করে। এসব ব্যয়ের চাপ থেকে সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্বজুড়ে নাগরিক অস্থিরতার গড় ঝুঁকি প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, আগামী এক দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছাবে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সীমিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের মতো উন্নত দেশেও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় এসব দেশের সরকার সংকটে থাকা পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য বেশি আর্থিক সক্ষমতা রাখে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভোক্তা মূল্যসূচকের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশজুড়ে খাদ্যের অবদান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ হার ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষ তুলনামূলক বেশি চাপে পড়েন।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো জরুরি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় বৃদ্ধির সুযোগ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অর্জন টেকসই করা কঠিন হবে।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.