বাজারে আসছে কনফিডেন্স পাওয়ার, কেমন করছে কনফিডেন্স সিমেন্ট

বুক বিল্ডিং পদ্ধতির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসার প্রস্তুতি শুরু করেছে কনফিডেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি। বিধি অনুসারে, কোম্পানিটি আগামীকাল রোববার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য রোড শো আয়োজন করেছে।

আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে ৪শ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায় বিদ্যুৎ খাতের এ কোম্পানি। সৌর বিদ্যুত উৎপাদনে করতে চায় বড় বিনিয়োগ। বর্তমানে কোম্পানিটি একাধিক ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করছে কোম্পানিটি, যার মোট মেগাওয়াট উৎপাদনে ক্ষমতা ২৯৩ মেগাওয়াট। সৌরবিদ্যুতে ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এর একটি অংশ সরাসরি নিজেরা বাস্তবান করবে, বাকীটা বাস্তবায়ন করা হবে ডোরিন পাওয়ার ও কনফিডেন্স এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে যৌথভাবে।

অনেক দিন পর বাজারে নতুন আইপিও আসছে। তা-ও আবার বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে। এর আগে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে বাজারে আসা বেশির ভাগ কোম্পানির পারফরম্যান্স প্রশ্নবিদ্ধ। এমনকি নির্ধারিত মূল্য পদ্ধতির (Fixed Price Method) আওতায় গত ১৫ বছরে যেসব কোম্পানি বাজারে এসেছে, সেগুলোর বড় অংশও জাংক শেয়ারে পরিণত হয়েছে।

তাই কনফিডেন্স পাওয়ারের আইপিওকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমন উদ্বেগও কম নয়। এ আলোচনার মধ্যে উঠে আসছে গ্রুপের প্রথম তালিকাভুক্ত কোম্পানি কনফিডেন্স সিমেন্ট পিএলসির (CCL) পারফরম্যান্স ইস্যু। চলছে এ কোম্পানির পারফরম্যান্সের বিশ্লেষণ।

বেসরকারি খাতের প্রথম সিমেন্ট কোম্পানি কনফিডেন্স সিমেন্ট ১৯৯৫ সাল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। শুরুটা সিমেন্ট দিয়ে হলেও পরবর্তীতে কোম্পানিটি বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। আর এ বিনিয়োগ হয়েছে একাধিক সহযোগী কোম্পানির মাধ্যমে।

তালিকাভুক্তির পর থেকে কনফিডেন্স সিমেন্ট নিয়মিত লভ্যাংশ ঘোষণা ও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির কারণে ব্লুচিপ কোম্পানি হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। তবে সর্বশেষ ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি তার শেয়ার প্রতি আয়ের (ইপিএস) মাত্র দশ ভাগের একভাগ লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়ায় বিনিয়োগকারী তথা সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বেশ হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দেয়। ওই বছর কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ১১ টাকা ২৩ পয়সা, যা ছিল সিমেন্ট খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এত বড় ইপিএসের বিপরীতে কোম্পানিটি মাত্র ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে, প্রতি শেয়ারে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ টাকা ১২ পয়সা।

সর্বশেষ বছরে স্বল্প লভ্যাংশ দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে কনফিডেন্স সিমেন্টের ভাইস-চেয়ারম্যান ইমরান করিম অর্থসূচককে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কোম্পানির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ ইত্যাদি অনেক বিষয় বিবেচনায় রেখে সাধারণত লভ্যাংশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়; তাতে কোম্পানির বড় হওয়ার সুযোগ যেমন থাকে, তেমনই ঝুঁকির মাত্রা অনেকটা কমে আসে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগকারীদেরই লাভ, তাদের কোম্পানির টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।

তালিকাভুক্ত সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ

তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে অর্থনীতিতে ধীর গতি চলছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অবকাঠামো নির্মাণ কমে গেছে। তাতে সিমেন্টের চাহিদার বড় পতন ঘটেছে। আগামী দিনে এরচেয়ে খারাপ হলেও যাতে কনফিডেন্স সিমেন্ট ধাক্কা সামলে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে, সে বিষয়টি মাথায় রেখে গতবছর লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, ‘গত ৩০ বছরে কনফিডেন্স সিমেন্ট গড়ে ১৮ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে। এই বাজারে কিন্তু খুব কম কোম্পানিরই এমন রেকর্ড আছে। আমাদের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ছিল বলেই কেবল এটা সম্ভব হয়েছে।’

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিসংখ্যান অনুসারে, তালিকাভুক্তির পর থেকে কনফিডেন্স সিমেন্ট নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়ার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। প্রথম বছর ৫ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিলেও পরবর্তীতে এর পরিমাণ বেড়েছে। ২০১০ সালে কোম্পানিটি সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে, যার মধ্যে ছিল ২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ও ১৫ শতাংশ বোনাস। ২০১৬ সালে ৩৭.৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি।

তালিকাভুক্তির পর ৩০ বছরের মধ্যে ১৫ বছর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ দিয়েছে কনফিডেন্স সিমেন্ট। পাঁচ বছর দিয়েছে ৫ থেকে ৭.৫০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ। ২০২২ সাল থেকে এটি ১০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিচ্ছে। তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে সর্বশেষ বছর পর্যন্ত কোম্পানিটির গড় লভ্যাংশ ছিল ১৮.৫৪ শতাংশ, সিমেন্ট খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যো দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এ সময়ে গড়ে সর্বোচ্চ লভ্যাংশ দিয়েছে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, তবে কোম্পানিটির ইপিএস ও লভ্যাংশে ধারাবাহিকতার বড় ঘাটতি রয়েছে।

শেয়ার প্রতি আয়ের (ইপিএস) দিক থেকেও ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে কনফিডেন্স সিমেন্ট পিএলসি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের ৭টি কোম্পানির মধ্যে কনফিডেন্স সিমেন্ট ও লাফার্জহোলসিম ছাড়া প্রতিটি কোম্পানি গত ৫ বছরের মধ্যে এক বা একাধিক বছর লোকসান গুনেছে।

পাঁচ বছরে কনফিডেন্সের গড় ইপিএস ছিল ৮ টাকা ১১ পয়সা, যা এ খাতে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১৫ টাকা ৮৬ পয়সা পর্যন্ত ইপিএস করেছিল কোম্পানিটি। পাঁচ বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪ টাকা ২৮ পয়সা ইপিএস ছিল হাইডেলবার্গ সিমেন্টের। এ সময়ে গড়ে শেয়ার প্রতি সবচেয়ে বেশি লোকসান গুনেছে আরামিট সিমেন্ট, যার পরিমাণ ১০ টাকা ৯৫ পয়সা। অন্যদিকে ৭ টাকা ৭০ পয়সা লোকসান গুনেছে মেঘনা সিমেন্ট। প্রিমিয়ার সিমেন্টের ইপিএস প্রতি গড় লোকসান হয়েছে ৮৩ পয়সা। বাকী দুটি কোম্পানির মধ্যে লাফার্জহোলসিম গড়ে ৩ টাকা ৯২ পয়সা ও ক্রাউন সিমেন্ট গড়ে ৩ টাকা ৯৯ পয়সা আয় করেছে।

কনফিডেন্স সিমেন্ট ১৯৯৫ সালে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ডিএসইর তথ্য অনুসারে, তালিকাভুক্তির বছরেই কোম্পানিটি ১:৪ অনুপাতে রাইট শেয়ার ইস্যু করে। পরবর্তীতে আরও দুই দফা রাইট ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালে কোম্পানিটি আরেক দফা রাইট শেয়ার ইস্যু করার আবেদন জানিয়েছিল। তবে রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন তখনকার কমিশন তাদের মেয়াদে কোনো আইপিও ও রাইট শেয়ার অনুমোদন করেনি। তখন কোম্পানি তার আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে কনফিডেন্স সিমেন্ট ঢাকা লিমিটেড থেকে তার বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়।

বর্তমানে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৮৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। শেয়ার সংখ্যা ৮ কোটি ৬২ লাখ। এই শেয়ারের ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ ধারণ করছেন এর উদ্যোক্তারা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আছে ৩৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কনফিডেন্স সিমেন্টের ৩১ দশমিক ১৩ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছেন।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.