বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত, জলবায়ু সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটের মধ্যেই আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। এবারের অধিবেশনের বিশেষ গুরুত্ব হলো—প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে পুরো অধিবেশন পরিচালনা করবেন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায় ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধন হবে। এর আগে স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় শেষ হবে সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশন। ৮১তম অধিবেশন চলবে ২০২৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: এ ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভার্স ফর অল’; অর্থাৎ ‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’। এই প্রতিপাদ্যের মধ্য দিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের খলিলুর রহমানের নেতৃত্ব
গত ২ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের খলিলুর রহমানকে নির্বাচিত করে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের পালাক্রমিক ব্যবস্থার আওতায় তিনি এ পদে নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পেল।
খলিলুর রহমান তাঁর ছয়টি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু কার্যক্রম, মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল শাসন এবং জাতিসংঘের বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা।
তিনি বিশেষভাবে যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ, উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বিশ্বনেতাদের নজর ২২ সেপ্টেম্বরের দিকে
৮ সেপ্টেম্বর অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও বিশ্বনেতাদের বহুল প্রত্যাশিত সাধারণ বিতর্ক শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর। ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বনেতারা সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেবেন।
এই সময় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান বৈশ্বিক নিরাপত্তা, যুদ্ধ-সংঘাত, অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজ নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরবেন।
এবারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোর মধ্যে ২৩ সেপ্টেম্বর জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তর নিয়ে বৈঠক, ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সভা এবং ২৫ সেপ্টেম্বর মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও মোকাবিলা নিয়ে বৈঠক রয়েছে।
আলোচনায় থাকবে যুদ্ধ ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা
ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, গাজা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে থাকা সামরিক সংঘাত এবারের সাধারণ বিতর্কে বড় জায়গা পেতে পারে। একই সঙ্গে পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও আলোচনা হবে।
বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের আলোচ্য বিষয়। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব কীভাবে বাড়ানো যায়—এ নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু সংকট
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাওয়া, ঋণের চাপ, দারিদ্র্য ও বৈষম্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতিও এবারের অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হবে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি নিয়ে বিশেষ আয়োজন রয়েছে। এরপর জলবায়ু কার্যক্রম, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন নিয়ে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়ন ইস্যু বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। খলিলুর রহমান তাঁর অগ্রাধিকারেও জলবায়ু সহনশীলতা, ক্ষয়ক্ষতির জন্য তহবিল এবং সমুদ্র ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তিও আলোচনায়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত অর্থনীতি, রাজনীতি, তথ্যব্যবস্থা ও নিরাপত্তার অংশ হয়ে ওঠায় এর সুশাসনও এবারের জাতিসংঘের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। খলিলুর রহমানের ঘোষিত অগ্রাধিকারের একটি হলো ‘ইনোভেশন উইথ ইনক্লুশন’, যার আওতায় ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, এআই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার, এআইয়ের সামরিক ব্যবহার এবং প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়গুলোও এ আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হবে।
১৯৩ দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৩টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এবং প্রতিটি দেশের একটি করে ভোট রয়েছে। সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি জাতিসংঘের বাজেট অনুমোদন এবং নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে।
এবারের অধিবেশনের বৈঠকগুলোকে ঘিরে নিউইয়র্কে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে বিপুলসংখ্যক বিশ্বনেতা, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধির উপস্থিতির কারণে শহরটির নিরাপত্তা ও যান চলাচল ব্যবস্থায় বাড়তি প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এদিকে এবারের অধিবেশনে সাধারণ পরিষদের হলে প্রথম আসন পাবে মরক্কো। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি অধিবেশনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আসন লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়; ৮১তম অধিবেশনে মরক্কো প্রথম আসন পেয়েছে এবং এরপর দেশগুলোর নাম ইংরেজি বর্ণানুক্রমে সাজানো হবে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধ ও সংঘাতের বিস্তার, জলবায়ু সংকট, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার সময়ে শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন। আর এই অধিবেশনের সভাপতির আসনে বাংলাদেশের খলিলুর রহমান থাকায় আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মঞ্চে এবার বাংলাদেশের ভূমিকাও বিশেষভাবে নজর কাড়বে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.