ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি ট্রাম্পের

ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, গত পাঁচ দশকে ইরানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়েছে, তার জন্য তেহরানকে অর্থ দিতে হবে।

সোমবার (১০ আগস্ট) হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ দাবি করেন। তার এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করছে ইরান।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো।

ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না।

ইরানের এই অবস্থান গত জুনে স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তির শর্তগুলোর সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ওই চুক্তি পরে ভেঙে যায়।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন ক্ষতিপূরণের দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরান ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও গত ৫০ বছরে ইরানের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য অর্থ চাইবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত চার মাসে ইরানে ৫২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের পাশাপাশি ইরানে নিহত বেসামরিক ব্যক্তিদের পরিবারের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

তবে ইরান জানিয়েছে, জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রায় ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (হরানা) ফেব্রুয়ারিতে প্রায় সাত হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল। তাদের হিসাবে, নিহতদের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন বিক্ষোভকারী।

এ ছাড়া ২০০০ সালের অক্টোবরে ইয়েমেনে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস কোল-এ হামলায় নিহত ১৭ মার্কিন নাবিকের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ইরানের ওপর চাপ দেওয়ার কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

তবে ওই হামলার জন্য আল-কায়েদাকে দায়ী করা হয়েছিল, ইরানকে নয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ইরানকে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও গাজায় মানুষের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির জন্যও দায়ী করা উচিত।

ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ওমানের সঙ্গে নতুন জাহাজ চলাচলের পথ নির্ধারণ নিয়ে একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে তারা।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই সোমবার বলেছেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘সুশৃঙ্খল ও গঠনমূলকভাবে’ এগোচ্ছে। দুই পক্ষ নতুন নৌপথের একটি মানচিত্র নিয়েও একমত হয়েছে। তবে কিছু কারিগরি বিষয় এখনো সমাধান হয়নি।

নিরাপদ নৌচলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা, সামুদ্রিক সেবা ও অপরাধ দমনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান বাঘেই।

তার অভিযোগ, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড’ নৌপথটিকে অনিরাপদ করে তুলেছে। ইরান হরমুজে মার্কিন নৌ অবরোধকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জুলাইয়ে অবরোধ পুনর্বহালের পর তারা ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে এবং অন্তত দুটি জাহাজকে অকার্যকর করেছে।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই অবরোধের কারণে ইরানের খার্গ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোমবার হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধকে ‘ইস্পাতের দেওয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি দাবি করেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শুধু মার্কিন নৌবাহিনীর হাতে। তার আরও দাবি, মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রণালিটি মাইনমুক্ত করেছে এবং নৌপথটি উন্মুক্ত রয়েছে।

তবে সামুদ্রিক পরিবহন-সংক্রান্ত তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১৫টি জাহাজ পার হলেও শনিবার তা কমে ১১টিতে এবং রোববার ছয়টিতে নেমে আসে।

তথ্য অনুযায়ী, ১৭টি জাহাজ ইরান নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার করেছে। আরও ১০টি জাহাজ এমন একটি পথে চলেছে, যেটিকে নির্দিষ্ট কোনো রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

ফলে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি দাবি এবং নতুন ক্ষতিপূরণের চাপের মধ্যে জাহাজ চলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.