দেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক এবং চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি ও তারল্য সংকট উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংকিং খাতের মধ্যে এই দুই ধরনের ব্যাংকই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এক বছর আগে একই সময়ে এ হার ছিল ২৯ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
একই সময়ে ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করা নয়টি চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৫২ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে এ হার ছিল ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থাপনার কারণে এই দুই শ্রেণির ব্যাংক তীব্র তারল্য চাপে রয়েছে।
মার্চ শেষে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) দাঁড়িয়েছে ১২০ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর গড় এডিআর ১০১ দশমিক ৬ শতাংশ। কয়েকটি ব্যাংকের এডিআর ১০০ শতাংশেরও বেশি, যা আমানতের তুলনায় অতিরিক্ত ঋণ বিতরণের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঋণ পোর্টফোলিও দ্রুত বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করায় চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর এডিআর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অথচ পুরো ব্যাংকিং খাতের গড় এডিআর বর্তমানে ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে অনেক স্বস্তিদায়ক অবস্থান নির্দেশ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমিত তারল্য ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা, দ্রুত ঋণ সম্প্রসারণ এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
গত বছর তীব্র তারল্য সংকট এবং এস আলম গ্রুপ ও নজরুল ইসলাম মজুমদারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথিত ঋণ অনিয়মের প্রেক্ষাপটে সংকটে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলার ঘাটতি এবং সম্ভাব্য সুশাসন সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে।
যদিও সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত তারল্য পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত করতে এডিআর কমাতে সক্ষম হয়েছে, তবে আমানত প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর থাকায় ইসলামী ও চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি এখনো উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে।
অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের অন্যান্য অংশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। দ্বিতীয় প্রজন্মের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশে রয়েছে। বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থান আরও শক্তিশালী; তাদের খেলাপি ঋণের হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং এডিআর ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যা পর্যাপ্ত তারল্য ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, ইসলামী ও চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ এবং দ্রুত বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, এডিআর গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় বিদ্যমান দুর্বলতা আরও বিস্তৃত আর্থিক ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.