ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে তেলের দামে নতুন উল্লম্ফন, ব্রেন্ট ছাড়াল ৯০ ডলার

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ায় সোমবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) ২টা ৪১ মিনিটে সেপ্টেম্বর মাসে সরবরাহযোগ্য ব্রেন্ট ক্রুডের আগাম চুক্তির দাম ২ দশমিক ০৯ ডলার বা ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ১৯ ডলারে ওঠে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম যে বাড়তে থাকবে, তা একরকম ধারণা করা হচ্ছিল। প্রথম দফা যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে উঠেছিল। এবার সেই রেকর্ড ছাড়াবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।

গত এপ্রিল মাসে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর অর্থ দিয়েও তেল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো জ্বালানি রেশনিং করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশেও তেলের পাম্পে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা যায় এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে যায়। এর আগে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পরও দেশে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছিল।

তেলের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায় এবং ডলার সংকট তৈরি হয়।

বিশ্ববাজারে তেলের বর্তমান দাম গত ১১ জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক উল্লম্ফন।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৭১ ডলার বা ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৪ দশমিক ২০ ডলারে ওঠে। এটি গত ১২ জুনের পর সর্বোচ্চ। আগস্টে সরবরাহযোগ্য ডব্লিউটিআইয়ের আগাম চুক্তির দাম গত সপ্তাহে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

গত সপ্তাহের শেষভাগে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা নয় রাত ইরানে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কুয়েত ও বাহরাইন জানিয়েছে, তারা নতুন করে ইরানের হামলার মুখে পড়েছে।

বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থা আইএনজি জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ বাস্তবতায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার অতিক্রম করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং উভয় পক্ষেই প্রাণহানি ঘটছে। এ উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে না এলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে আবারও বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে।

ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণের একটি বিকল্প পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটেছে, এতে ট্যাংকার দুটি অচল হয়ে পড়ে। আইআরজিসির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ট্যাংকারগুলোকে ওই পথ ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়েছিল। তবে রয়টার্স বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

সম্প্রতি উভয় পক্ষই জাহাজে হামলা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের নির্ধারিত নিয়ম না মানা জাহাজে হামলা করা হচ্ছে। বিশ্বের সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়।

আজ ভোরে যুক্তরাজ্যের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের কুমজার উপকূলের উত্তর-পশ্চিমে একটি জাহাজে আগুন লেগেছে।

বার্কলেজের বিশ্লেষক অমরপ্রীত সিং বলেন, দুই পক্ষের নতুন অবরোধের মধ্যে এ অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি কতটা টেকসই হবে, তা আগামী কয়েক দিনের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। তিনি বলেন, সরবরাহ-সংকটের যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, বাজার এখনো তা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করছে না। বর্তমানে তেলের মজুত গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, রোববার মাত্র চারটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। আগের দিন এ সংখ্যা ছিল আটটি। শুক্রবারের পর থেকে পরিশোধিত জ্বালানি বহনকারী অন্তত তিনটি ট্যাংকার এবং একটি বৃহৎ জাহাজ তেল বোঝাইয়ের জন্য হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করেছে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.