যুদ্ধের উত্তেজনা কমতেই, ফরাসি ওয়াইনে ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের

‘শুল্ক’ শব্দটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে পছন্দের শব্দগুলোর একটি। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাঁর মুখে শব্দটি খুব একটা শোনা যায়নি।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা থিতিয়ে আসছে। যুদ্ধবিরতির সমঝোতা সই হবে শুক্রবার, তা সে যতই ভঙ্গুর হোক না কেন। ফলে দীর্ঘ এক মাসের যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় ট্রাম্প আবার শুল্ক ইস্যুতে ফিরেছেন। এতে আবার দ্রুতই নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

ফ্রান্সে চলমান জি-সেভেন শীর্ষ সম্মেলনের আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ যদি ৩ শতাংশ ডিজিটাল সেবা কর প্রত্যাহার না করেন, তাহলে ফরাসি ওয়াইনের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। ফ্রান্সের এই ডিজিটাল করের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের মহিরুহ প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন, অ্যালফাবেট, অ্যাপল ও মেটার ওপর।

নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মাখোঁকে বলেছিলাম, আমেরিকান কোম্পানিগুলোর ওপর যেন করারোপ না করা হয়। যদি তারা তা-ই করে, তাহলে ফ্রান্স থেকে আসা সব শ্যাম্পেন ও ওয়াইনের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ ছাড়া আমার উপায় থাকবে না।’

ফ্রান্স ২০১৯ সালে এই কর চালু করার পর থেকেই ট্রাম্প এমন হুমকি দিয়ে আসছেন। সর্বশেষ সতর্কবার্তার আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতেও তিনি ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। মাখোঁ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে গাজা ইস্যুতে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘শান্তি বোর্ডে’ তিনি যোগ দেবেন না, সেই পরিপ্রেক্ষিতে এমন হুমকি দেন ট্রাম্প।

তবে নানা কারণে ট্রাম্প এখনো সেসব হুমকি বাস্তবায়ন করেননি।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা এবং ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে দেওয়া নতুন শুল্ক হুমকির মধ্যে সম্পর্ক নেই। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেসাই বলেন, এটি প্রেসিডেন্টের আগের অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা।

ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের বাইরে ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের গাড়িতেও শুল্ক বৃদ্ধির কথা বলেছেন। তাঁর অভিযোগ, গত গ্রীষ্মে যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তা লঙ্ঘন করছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর জাপান, চীন ও ভারতের সব পণ্যে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। অভিযোগ, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি করছে।

আগামী মাসে সাময়িক ১০ শতাংশ আমদানি করের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন শুল্ক কার্যকর হতে পারে।

আগের শুল্কের ধাক্কা এখনো কাটেনি

গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে, অনেক নিয়োগের সিদ্ধান্ত থমকে যায়। পরে এসবের বেশির ভাগই সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেন।

এক বছরের বেশি সময় পর শ্রমবাজারে সেই প্রভাব কিছুটা কমতে শুরু করেছে। অনিশ্চিত বাণিজ্য পরিস্থিতির কারণে যেসব নিয়োগদাতা আগে কর্মী নিয়োগে দ্বিধায় ছিলেন, তাঁরা আবার নিয়োগ দিচ্ছেন। গত তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ৮৮ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। অথচ গত বছর এই সংখ্যা মাসে ১০ হাজারের কম ছিল।

তবে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। তা গত মাসে বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ, তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ভোক্তা মূল্যসূচক অনুযায়ী, মাসিক ভিত্তিতে দাম বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। এর ৬০ শতাংশের জন্য দায়ী জ্বালানির উচ্চ মূল্য।

এই পরিস্থিতিতে নতুন করে শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা অর্থনীতির জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে অর্থনীতিবিদেরা এখনো খাদ্য ও জ্বালানিবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে স্বস্তি খুঁজছেন, যাকে বলে কোর ইনফ্লেশন। মে মাসে এই সূচক মাসিক ভিত্তিতে বেড়েছে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ এবং বার্ষিক ভিত্তিতে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। যদিও ভোক্তা মূল্যসূচক ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ।

এর অর্থ, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির বর্ধিত মূল্যের কারণে এখনো অন্য পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়নি। যদিও ব্যবসার অন্যতম বড় খরচের জায়গা হলো জ্বালানি; দাম বাড়লে প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত সেই চাপ ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেয়।

তবে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরলেও কোনো কিছু স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।

ফরাসি ব্যাংক বিএনপি পারিবাসের অর্থনীতিবিদেরা গত সপ্তাহে এক বিশ্লেষণে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও মহামারি-পরবর্তী মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো স্থায়ী মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে রয়েছে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.