ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্র সাইপ্রাসে বাংলাদশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন বিলাসবহুল একটি দোতলা বাড়ি ক্রোক হয়েছে। দেশটিতে ৮০০ কোটি ইউরো পাচারের অভিযোগ তদন্তের মুখে কর্তৃপক্ষ বাড়িটি ক্রোক করেছে।
বাংলাদেশের আবেদনের প্রেক্ষিতে এস আলমে অর্থ পাচারের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে সাইপ্রাস সরকার।
খবর সাইপ্রাস মেইলের।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সংবাদপত্রটিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে চলমান ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে নিকোসিয়া জেলা আদালত লিমাসসোল জেলার পারেকলিসিয়ায় অবস্থিত সাইফুল আলমের ওই সম্পত্তি ক্রোক করে।

সাইপ্রাসের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিটের (মোকাস) একটি আবেদনের পর গত ১৯ মে এ ক্রোক আদেশ জারি করা হয়। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শুরু হওয়া পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রক্রিয়ার অধীনে এই তদন্তের অনুরোধ করা হয়েছিল।
এস আলম নামে বেশি পরিচিত সাইফুল আলম অবশ্য কোনো ধরনের অন্যায় বা অপরাধের কথা অস্বীকার করেছেন।
তার প্রতিষ্ঠিত এস আলম গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও ‘বিতর্কিত’ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। শুরুর দিকে পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত থাকলেও গত দুই দশকে গ্রুপটির বযবসার পরিধি অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে গত আওয়ামীলীগ সরকারের ১৫ বছরের মেয়াদে গ্রুপটির অবিশ্বাস্য রকম উত্থান ঘটে। এ সময়ে গ্রুপটি ব্যাংক, বীমা, গণমাধ্যম, বিদ্যুৎ ও হোটেল খাতে বেশ আধিপত্য বিস্তার করে। সরকারের প্রশ্রয়ে অর্ধডজন ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেগুলোতে বেপরোয়া লুটতরাজ শুরু করে বলে অভিযোগ আছে। এ সময়ে ব্যাংক খাত থেকে বেনামি ঋণের আড়ালে কয়েক লাখ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করার অভিযোগ উঠে। এর একটি বড় অংশ সা্ইপ্রাসে পাচার করা হয়েছে বলে জানা যায়।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতে দুর্নীতি, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। তার এবং তার পরিবারের সদস্যসহ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ, সম্পত্তি জব্দের আদেশ এসেছে আদালত থেকে।
সর্বশেষ গত ২১ মে ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া ৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ না করায় এস আলমসহ ১১ জনকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেয় চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত। আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের গ্রেপ্তারে সাজা পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।
সাইপ্রাস মেইলের খবর বলছে, সাইফুল আলম ২০১৬ সালে ‘সিটিজেন-বাই-ইনভেস্টমেন্ট’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন; যা স্থানীয়ভাবে ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট স্কিম’ নামেও পরিচিত। তবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের থেকে পাওয়া অভিযোগের পরে তার ওই নাগরিকত্ব বাতিল করে সাইপ্রাস সরকার।
যদিও নাগরিকত্ব পাওয়ার ওই প্রোগ্রামের কার্যক্রম পরীক্ষা করে দেখা সাইপ্রাস সরকারের ‘নিকোলাটোস কমিটির’ প্রতিবেদনে সাইফুল আলমের নাম আসেনি।
সাইপ্রাস মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তদন্তকারীদের জমা দেওয়া নথি অনুসারে, সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কোম্পানিগুলোর একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই তদন্তের মধ্যে ‘প্রতারণামূলকভাবে’ ঋণ গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করায় সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতের দেওয়া কারাদণ্ডের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে সাইপ্রাস মেইলের প্রতিবেদনে। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের বরাতে সেখানে বলা হয়েছে, ওই ঋণ নেওয়া হয়েছিল ১৩৪টি বাস কেনার কথা বলে, যা শেষ পর্যন্ত কেনা হয়নি।
সাইপ্রাস মেইল লিখেছে, সাইফুল আলম ওরফে এস আলমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তদন্ত ওই একটি মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সাইপ্রাসে পাঠানো অনুরোধ অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তার মালিকানার বিভিন্ন কোম্পানির বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার বিষয়েও তদন্ত করছে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ।
সাইপ্রাস সরকারকে করা বাংলাদেশের অনুরোধে বলা হয়, সাইফুল আলম ওই ঋণগুলোর মধ্যে অনেকগুলো পরে খেলাপি হয়ে যায়। এখন তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, তিনি নিজে ও তার কোম্পানিগুলো ওই অর্থ কোনো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছিলেন কিনা।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও বলেছেন, এস আলম গ্রুপ প্রায় ৮০০ কোটি ইউরোর বেশি অর্থ দেশ থেকে পাচার করেছেন। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ মনে করে, এই তদন্তের সঙ্গে যুক্ত সম্পদ সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর এবং অন্যান্য দেশে থাকতে পারে।
সাইপ্রাস মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়, সে দেশে নিবন্ধিত কোম্পানি ‘একলেয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ নিয়েও তদন্ত চলছে। ২০১৬ সালে সাইফুল আলম ওই কোম্পানিটি ‘একলেয়ার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামে কিনে নেন। তদন্তাধীন তহবিল স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কোম্পানি ব্যবহার করা হয়েছিল কিনা, তা এখন খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ।
সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে আদালতের কাগজপত্রে সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এবং জার্সিতে থাকা কোম্পানি ও ট্রাস্টের একটি নেটওয়ার্কের কথাও বলা হয়েছে। তদন্তকারীরা ওই কোম্পানিগুলোর মালিকানার কাঠামো এবং আর্থিক কার্যক্রমও খতিয়ে দেখছেন।
তবে সাইফুল আলম আন্তর্জাতিক ল ফার্ম ‘কুইন ইমানুয়েল’ এর প্রতিনিধির মাধ্যমে দাবি করেছেন, তার বিনিয়োগগুলো বৈধ বিদেশি উৎসের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে ‘অন্যায়ভাবে’ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (আইসিএসআইডি)–এর মাধ্যমেও আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
সেখানে সাইফুল আলম দাবি করেছেন, যে যুক্তিতে তার সম্পদকে প্রভাবিত করার মত পদক্ষেপগুলো (যার মধ্যে ক্রোক আদেশও রয়েছে) নেওয়া হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তিগুলোর লঙ্ঘন।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.