ব্যাংকিং খাতে প্রথম ইন্টারেক্টিভ সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট ইউসিবির

টেকসই অর্থায়নে ১৭ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা বিতরণ করেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি)। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির মোট ঋণ বিতরণের ৭২ দশমিক ২৯ শতাংশই ছিল এ খাতে। পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব, সুশাসন এবং জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নিজেদের কার্যক্রম তুলে ধরে প্রথমবারের মতো ওয়েবভিত্তিক ইন্টারেক্টিভ সংস্করণসহ সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ব্যাংকটি।

‘ট্রান্সফর্মিং ইনটেন্ট ইনটু প্ল্যানেটারি ইমপ্যাক্ট’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ইউসিবির তৃতীয় সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট। সম্প্রতি ব্যাংকটির করপোরেট কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শরীফ জহির। এ সময় পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড আইএফআরএস এস১ ও এস২ অনুসরণ করে তৈরি প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সুশাসন, জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই অর্থায়নের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউসিবি টেকসই অর্থায়নে ১৭ হাজার ৯২৭ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ২০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ব্যাংকটির মোট ঋণ বিতরণে এ খাতের অংশ ছিল ৭২ দশমিক ২৯ শতাংশ।

একই বছর পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন ফাইন্যান্স খাতে ৪৮৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বিতরণ করেছে ব্যাংকটি। মেয়াদি ঋণ বিতরণের ৩০ দশমিক ৪০ শতাংশ ছিল এ অর্থায়ন, যেখানে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ শতাংশ। বছর শেষে গ্রিন ফাইন্যান্সের বকেয়া স্থিতি দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৪৪ কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে সহায়তা দিতে ইউসিবি ২৭টি পরিবেশবান্ধব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন করেছে, যেগুলো লিড সনদপ্রাপ্ত। এর মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠান প্ল্যাটিনাম এবং ১৩টি গোল্ড সনদ পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি কার্যক্রমে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি রপ্তানি সুবিধা দিয়েছে ব্যাংকটি।

কার্বন নিঃসরণ পরিমাপের ক্ষেত্রেও কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশ করেছে ইউসিবি। আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের সহায়তায় ব্যাংকটির নিজস্ব কার্যক্রম ও জ্বালানি ব্যবহার থেকে সৃষ্ট সরাসরি এবং পরোক্ষ নিঃসরণ—স্কোপ ১ ও স্কোপ ২—হিসাব করা হয়েছে। ঋণ ও অর্থায়নের মাধ্যমে সৃষ্ট নিঃসরণ বা স্কোপ ৩ পরিমাপে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক জয়েন্ট ইমপ্যাক্ট মডেল ফাউন্ডেশনের কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে ইউসিবির অর্থায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্বন নিঃসরণ ছিল ১৯ লাখ ১২ হাজার ২১২ দশমিক শূন্য ৬ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য। প্রতি কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে নিঃসরণের ঘনত্ব ছিল ৩৭ দশমিক ৫২ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ঋণ মূল্যায়ন ও অর্থায়নের সময় পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা করছে ব্যাংকটি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভৌত ঝুঁকি এবং কম কার্বননির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ইউসিবি।

ব্যাংকটির চেয়ারম্যান শরীফ জহির বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ব্যাংক হিসেবে ইউসিবি মনে করে, মূলধনকে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণেও কাজ করছে ব্যাংকটি। বর্তমানে ইউসিবির ৩৪টি সৌরবিদ্যুৎচালিত শাখা ও চারটি সৌরবিদ্যুৎচালিত এটিএম রয়েছে। এ ছাড়া দেশের ৬৪ জেলায় ৬৩০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং গ্রাম ও শহরের উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ৫০টি বিশেষায়িত টেকসই অর্থায়ন সহায়তা ডেস্ক পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইউসিবির বিতরণ করা ঋণ দেশের বিভিন্ন খাতে দুই লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে। এসব কর্মসংস্থানের প্রায় ৩০ শতাংশে রয়েছেন নারী কর্মী। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি জাতীয় কোষাগারে ১৮ হাজার ৩০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ বলেন, ব্যাংকটি টেকসই ব্যাংকিংকে শুধু করপোরেট বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।

ব্যাংকটির দাবি, ওয়েবভিত্তিক ইন্টারেক্টিভ প্রতিবেদন চালুর ফলে টেকসই কার্যক্রম ও অগ্রগতির তথ্য পাঠক, বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অন্যান্য অংশীজনের কাছে আরও সহজে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.