ডিএসইর ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকা মুক্ত ডোরিন পাওয়ার, মুনাফা বেড়েছে ৫৮ শতাংশ

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি ডোরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেডের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিয়ে আর কোনো অনিশ্চয়তা উল্লেখ করা হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ ধরনের পর্যবেক্ষণ না থাকায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গোয়িং কনসার্ন বা ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিয়ে ঝুঁকিতে থাকা কোম্পানির তালিকা থেকে প্রতিষ্ঠানটির নাম সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ আলোচ্য অর্থবছরের জন্য ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ বেড়েছে।

এর আগে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ থাকায় ডোরিন পাওয়ারকে নন-মার্জিনেবল সিকিউরিটিজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছে আবেদন করলেও তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান হয়নি। নিয়মিত মুনাফা, লভ্যাংশ প্রদান এবং ‘এ’ শ্রেণিতে লেনদেনের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিটির নাম ঝুঁকির তালিকায় থাকায় তখন বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।

সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা উল্লেখ না থাকায় বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানিটির আর্থিক সূচকেও উন্নতি দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে প্রায় ৫৮ শতাংশ এবং শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৬১ শতাংশ।

কেন ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকায় ছিল ডোরিন পাওয়ার

কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ‘ম্যাটেরিয়াল আনসার্টেনটি রিলেটেড টু গোয়িং কনসার্ন’ শিরোনামে একটি অনুচ্ছেদ ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মার্জিন বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ১১(৬) অনুযায়ী ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানিটিকে জামানতবিহীন লেনদেনের অযোগ্য সিকিউরিটিজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। একই সঙ্গে এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিয়ে ঝুঁকিসম্পন্ন কোম্পানির তালিকায় ডোরিন পাওয়ারের নাম প্রকাশ করা হয়।

গোয়িং কনসার্ন বলতে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতেও ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে বোঝায়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ বিষয়ে অনিশ্চয়তার কথা থাকলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ আয়, ব্যবসা পরিচালনা ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন পর্যবেক্ষণ বিনিয়োগ সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে ডোরিন পাওয়ারের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার বিষয়টি মূল কোম্পানির একক আর্থিক বিবরণী ও গ্রুপের সমন্বিত আর্থিক বিবরণীর পার্থক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। কোম্পানিটির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোং পরবর্তীতে লিখিত ব্যাখ্যায় জানায়, সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদটি শুধু মূল কোম্পানির একক আর্থিক বিবরণীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা

নিরীক্ষকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে ডোরিন পাওয়ারের মোট ৬৬ মেগাওয়াট সক্ষমতার তিনটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়াকে বিবেচনায় নিয়ে ওই অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছিল।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় মূল কোম্পানির একক আর্থিক বিবরণীতে ভবিষ্যৎ ব্যবসা পরিচালনার ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উঠে আসে। তবে গ্রুপের সমন্বিত আর্থিক অবস্থায় ভিন্ন চিত্র ছিল।

কোম্পানিটির তিনটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বৈধ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। এসব চুক্তির মেয়াদ ২০৩১ ও ২০৩৭ সাল পর্যন্ত রয়েছে। এ কারণে গ্রুপ পর্যায়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা নেই বলে নিরীক্ষক ব্যাখ্যা দেন।

অর্থাৎ মূল কোম্পানির কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ফলে একক আর্থিক বিবরণীর পর্যবেক্ষণকে পুরো গ্রুপের ব্যবসায়িক সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করলে কোম্পানিটির সামগ্রিক অবস্থান সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও কমিশনে আবেদন করেও তখন সমাধান মেলেনি

ঝুঁকির তালিকায় নাম প্রকাশের পর ডোরিন পাওয়ার কর্তৃপক্ষ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। কোম্পানির বক্তব্য ছিল, নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদটি মূল কোম্পানির একক আর্থিক বিবরণীর জন্য প্রযোজ্য। গ্রুপের সমন্বিত আর্থিক বিবরণীতে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একই ধরনের অনিশ্চয়তা নেই।

তবে সে সময় আবেদনের ভিত্তিতে তালিকা থেকে নাম প্রত্যাহারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানি হিসেবে ডোরিন পাওয়ারের নাম থেকে যায়।

বিষয়টি নিয়ে শেয়ারবাজারে আলোচনা তৈরি হয়। ২০১৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে কোম্পানিটির শেয়ার ‘এ’ শ্রেণিতে লেনদেন হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা করেছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও দিয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদনে আয় ও মুনাফার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে নিরীক্ষা প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে কোনো কোম্পানিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে সেই ঝুঁকির ধরন ও পরিধি বিনিয়োগকারীদের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ, ঝুঁকির তালিকায় নাম থাকলে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।

মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৫৮ শতাংশ

ঝুঁকির তালিকা থেকে নাম প্রত্যাহারের পাশাপাশি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আর্থিক সূচকেও উন্নতি করেছে ডোরিন পাওয়ার। ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৫ টাকা ৩ পয়সা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ আয় ছিল ৩ টাকা ১৯ পয়সা।

এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ১ টাকা ৮৪ পয়সা। শতাংশের হিসাবে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ আগের অর্থবছরের তুলনায় আলোচ্য বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

পরিচালন নগদ প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৬১ শতাংশ

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডোরিন পাওয়ারের শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ হয়েছে ১৮ টাকা ৯৬ পয়সা। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ১১ টাকা ৭৮ পয়সা।

সে হিসাবে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ বেড়েছে ৭ টাকা ১৮ পয়সা। শতাংশের হিসাবে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬১ শতাংশ।

পরিচালন নগদ প্রবাহের মাধ্যমে ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থের প্রবাহ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নে শেয়ারপ্রতি আয় ও পরিচালন নগদ প্রবাহের পাশাপাশি অন্যান্য আর্থিক সূচকও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য ৫৭ টাকা ১২ পয়সা

২০২৬ সালের ৩০ জুন শেষে ডোরিন পাওয়ারের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ৫৭ টাকা ১২ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫২ টাকা ৪৫ পয়সা।

এক বছরে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়েছে ৪ টাকা ৬৭ পয়সা। শতাংশের হিসাবে এ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য, আয় ও পরিচালন নগদ প্রবাহ কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে এককভাবে ভবিষ্যৎ শেয়ারদর বা বিনিয়োগের সম্ভাব্য মুনাফা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের সুপারিশ

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছে ডোরিন পাওয়ারের পরিচালনা পর্ষদ। গত ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কোম্পানিটির শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা। সে হিসাবে ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের অর্থ হলো, প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে শেয়ারহোল্ডাররা ১ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল। সে তুলনায় এবার লভ্যাংশের হার বেড়েছে ৫ শতাংশ পয়েন্ট।

তবে পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশ কার্যকর হতে বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন প্রয়োজন। লভ্যাংশ পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারিত হবে ঘোষিত রেকর্ড তারিখ অনুযায়ী।

কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভা আগামী ২৪ ডিসেম্বর সকাল ১১টায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, লভ্যাংশের সুপারিশ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

কোম্পানির মূলধন ও শেয়ারহোল্ডিং চিত্র

২০১৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ডোরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেড বিদ্যুৎ খাতের একটি কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির বাজার মূলধন ৫৫৯ কোটি ৬৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা এবং বাজারে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের ভিত্তিতে বাজার মূলধন ১৫৮ কোটি ৩৫ লাখ ১ হাজার টাকা। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ২০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১৮১ কোটি ১১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। মোট শেয়ারসংখ্যা ১৮ কোটি ১১ লাখ ১৮ হাজার ৯০১টি।

সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে ৬৬ দশমিক ৬১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ১৬ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ১৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ শেয়ার।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.