ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেহরদাদ আখলাঘি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ৬৮ বছর বয়সী সামরিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচি। রোববার (১৮ অক্টোবর) দেশটির পার্লামেন্ট তাঁর মনোনয়ন অনুমোদন করেছে। ইরানের সামরিক শিল্প পুনর্গঠন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে দেশটির পার্লামেন্টের অধিবেশন অনলাইনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগের ভোটাভুটিতে তাঁর পক্ষে ২৩৭ জন আইনপ্রণেতা ভোট দেন। বিপক্ষে ভোট দেন ১৫ জন।

যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এরপর থেকে মজিদ ইবনে-রেজা ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। নতুন নিয়োগের পর তিনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে কাজ করবেন।

ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞতা

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আখলাঘির বিশেষ দক্ষতা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট ইঞ্জিন, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে। এর আগে তিনি শাহিদ বাঘেরি ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ, অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন ও ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আখলাঘি এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকাতেও রয়েছেন।

ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাসনিমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্র উন্নয়ন প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত ছিলেন আখলাঘি। দেশটির সেজিল ও জুলফিকার সিরিজের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আলমাস ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইয়াসিন গাইডেড বোমা তৈরিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সেমনানের ইমাম খোমেনি মহাকাশকেন্দ্রে মহাকাশযান ও গবেষণার কাজে ব্যবহৃত রকেটের অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ করেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের সামরিক শিল্প অবকাঠামো পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব এখন নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওপর পড়েছে।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে আখলাঘির ৪২ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা আগেই দেশের শীর্ষ সামরিক কর্তৃপক্ষ, প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির অনুমোদন পেয়েছে।

পার্লামেন্টে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কোনো দেশের ওপর আগ্রাসন চালানো প্রথম পক্ষ হবে না। তবে যেকোনো আক্রমণের বিরুদ্ধে দেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষায় শেষনিশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করবে।’

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা

চলতি মাসের শুরুতে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালাই-নিক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আখলাঘির মনোনয়ন কৌশলগত অস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিফলিত করে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির গুণগত উন্নয়ন এবং উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা ইরানের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে তেহরানের বক্তব্য, মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমা হামলার নাগালের বাইরেও তাদের পর্যাপ্ত আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা রয়েছে। যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এসব সক্ষমতা আরও উন্নত করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রকে আখলাঘির হুঁশিয়ারি

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আখলাঘি। ইরানের পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা ব্যবহারের হুমকির জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি এবং সম্পূর্ণ নিশ্চিন্তে আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এখন ভাবতে হবে, কীভাবে তিনি এ অঞ্চল থেকে তাঁর সেনাদের নিরাপদে ফিরিয়ে নেবেন। ইরানে বোমা হামলা হলে কতজন মার্কিন সেনাকে কফিনে করে ফিরতে হবে, তা ট্রাম্পকে বিবেচনা করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

আখলাঘি জানান, যুদ্ধ চলাকালে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সামরিক প্রয়োজন সম্পর্কে ধারণা নিতে তিনি আইআরজিসির প্রধান জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদিসহ শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে সামরিক শিল্পের দ্রুত বিকাশ, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি সংযোজন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতা বাড়ানো।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.