ইউক্রেনের রপ্তানিপথে রাশিয়ার হামলা, বাংলাদেশকে সতর্ক করল ইইউ

কৃষ্ণসাগর, দানিউব নদী ও স্থলপথে ইউক্রেনের খাদ্য রপ্তানির সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত করছে রাশিয়া। এর ফলে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেরও সতর্ক থাকা উচিত বলে জানিয়েছে বাংলাদেশে কর্মরত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদল।

বুধবার এক বিবৃতিতে প্রতিনিধিদলটি বলেছে, খাদ্যকে যুদ্ধের আরেকটি অস্ত্রে পরিণত হতে দেওয়া বিশ্বের উচিত নয়। ইউক্রেনের বন্দর, গুদাম, অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা, নৌপরিবহন ও কৃষি অবকাঠামোয় রাশিয়ার পরিকল্পিত হামলা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার ওপর আঘাত। এসব হামলায় বাণিজ্য, জ্বালানি ও সারের বাজারও বিঘ্নিত হচ্ছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘খাদ্যকে যুদ্ধের আরেকটি অস্ত্রে পরিণত হতে দেওয়া বিশ্বের উচিত নয়। ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করতে পারে- এমন একটি যুদ্ধবিরতি ইউক্রেনীয়দের প্রতিদিনের দুর্ভোগ বন্ধ করা এবং লাখো মানুষের বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা স্থিতিশীল করার জন্য প্রয়োজন।’

বাংলাদেশে ইইউ প্রতিনিধিদলের প্রধান ও রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে, জার্মানির রাষ্ট্রদূত রুডিগার লোটজ, ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জোরিস ফন বমেল এবং নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্সেন যৌথভাবে এ বিবৃতি দেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করে ইউক্রেনের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও রপ্তানিপথে হামলা বন্ধ করলে এর সুফল ইউরোপের বাইরেও পৌঁছাবে। বাংলাদেশও এর সুফল পেতে পারে। কারণ, বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা শুধু দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত খাদ্যের ওপর নির্ভর করে না, সমুদ্রপথে নিরাপদে খাদ্য পরিবহনের ওপরও নির্ভরশীল।

প্রতিনিধিদলটি জানায়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শস্য রপ্তানিপথ আবারও হামলার শিকার হচ্ছে, এমন এক সময়ে যখন বিশ্বের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ ক্ষুধার মুখে রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ইউক্রেন থেকে শস্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকুচিত হয়, দাম বাড়ে এবং এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর। হামলার সময়টিও অত্যন্ত প্রতিকূল। আগস্টে ইউক্রেনে ফসল কাটার মৌসুম শুরু হওয়ার সময় পরিবহনপথ ও রপ্তানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে শস্য, তৈলবীজ ও অন্যান্য কৃষিপণ্য দেশটির ভেতরে আটকে পড়ে। ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় ২০২৬ সালের আগস্টে দেশটির শস্য রপ্তানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। এরইমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, অক্টোবরে ইউক্রেনের মজুত সক্ষমতা ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। নভেম্বর নাগাদ ৯০ লাখ টনের বেশি শস্য, তৈলবীজ ও শস্য প্রক্রিয়াজাতকরণের উপজাত সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার বাইরে থেকে যেতে পারে। লাখো মানুষের খাদ্যের জোগান দিতে সক্ষম এমন ফসলও তখন আটকে পড়তে পারে। কৃষকেরা চলতি মৌসুমের ফসল বিক্রি করতে না পারলে পরবর্তী মৌসুমে বীজ বপনের জন্য তাদের হাতে অর্থও তেমন থাকবে না। ফলে ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং সংকট আগামী বছরেও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

এতে বলা হয়, এমন পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ বিশ্বে আনুমানিক ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে ক্ষুধার মুখে রয়েছে। সামুদ্রিক পরিবহনপথ, জ্বালানিবাজার, বাণিজ্যপ্রবাহ ও মানবিক সহায়তার সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের প্রভাব সংঘাতের এলাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটও এর উদাহরণ। খাদ্যের দাম ও সরবরাহে নতুন কোনো ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সবচেয়ে কম যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠীর, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশকে এ বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশে দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত খাদ্যশস্য গম। দেশের গমভিত্তিক খাদ্যের চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ নির্ভরশীলতার কারণে গম উৎপাদনকারী প্রধান অঞ্চলগুলোতে বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপথে অস্থিতিশীলতার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে।

বিবৃতিতে বলা হয়, এটি নিছক আশঙ্কা নয়। চার বছর আগে যুদ্ধের কারণে সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার পর বাংলাদেশ দ্রুতই এর প্রভাব অনুভব করে। গম আমদানির ব্যয় বেড়ে যায়, পাশাপাশি দেশের বাজারে গম ও গমজাত খাদ্যের দামও বাড়ে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

ইইউ প্রতিনিধিদলের ভাষ্য, রাশিয়া যুদ্ধের শুরু থেকেই বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে খাদ্যসংকটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা দেশটির বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ইউক্রেনের রপ্তানিপথে হামলা চালিয়ে রাশিয়া শুধু কিয়েভকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে না, বরং খাদ্যকে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির অংশ করে তোলার ক্ষেত্রে বাকি বিশ্ব কতটা চাপ সহ্য করবে, সেটিরও পরীক্ষা করছে। এ পরিস্থিতির ক্ষতির শিকার হচ্ছে বাংলাদেশও।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.