বুক বিল্ডিং পদ্ধতির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রি করে তালিকাভুক্ত হতে চায় কনফিডেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি। এই পদ্ধতির আইপিও’র শর্ত হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আগামী ১৮ অক্টোবর রোড শো’র আয়োজন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কোম্পানিটি আইপিওর রেড হেয়ারিং প্রসপেক্টাস প্রকাশ করেছে।
পাঠকদের জন্য কোম্পানিটির আইপিওর বিভিন্ন বিষয় সংক্ষেপে তুলে ধরা হল।
কোম্পানি পরিচিতিঃ
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি মূলতঃ বিদ্যুৎ ব্যবসায় নিয়োজিত কোম্পানি। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে এই কোম্পানির ব্যবসা। এটি ২০১৭ সালে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। আর ২০২৪ সালে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ২৫০ টাকা, আর ১৪৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা হচ্ছে এর পরিশোধিত মূলধন (আইপিও-পূর্ববর্তী)।
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি’র ১১৩ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এটি ফার্নেস অয়েলে পরিচালিত হয়। কেন্দ্রটি ২০১৯ সালে উৎপাদনে যায়। আগামী ২০২৯ সাল পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনা-বেচার চুক্তি রয়েছে।
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি একটি হোল্ডিং কোম্পানি। এর অধীনে ৪টি সহযোগী কোম্পানি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া লিমিটেড, কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুর লিমিটেড, জোডিয়াক পাওয়ার চিটাগং লিমিটেড এবং কনফিডেন্স ডরিন পাওয়ার লিমিটেড। প্রথম তিনটি কোম্পানি ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করে। কোম্পানি তিনটির মধ্যে কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া লিমিটেড ও কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুর লিমিটেডের উৎপাদনক্ষমতা ১১৩ মেগাওয়াট করে ২২৬ মেগাওয়াট। জোডিয়াক পাওয়ার চিটাগং লিমিটেডের উৎপাদনক্ষমতা হচ্ছে ৫৪.৩৬ মেগাওয়াট।
কনফিডেন্স ডরিন পাওয়ার লিমিটেড হচ্ছে কনফিডেন্স পাওয়ার ও ডোরিন পাওয়ারের যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি। চলতি বছর প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানি ১০০ মেগাওয়াটক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করবে। ইতোমধ্যে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে একটি ২০ বছর মেয়াদি চুক্তি হয়েছে। প্রকল্পটি নির্মাণাধীন আছে।
সহযোগী কোম্পানিগুলোর মধ্যে কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া লিমিটেড, কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুর লিমিটেড ও জোডিয়াক পাওয়ার চিটাগং লিমিটেডের ৯৯.৯৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি। অন্যদিকে কোম্পানিটি কনফিডেন্স ডরিন পাওয়ার লিমিটেডের ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছে।
আইপিওতে টাকা উত্তোলন ও ব্যবহারঃ
আইপিওর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৪শ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায় কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি। উত্তোলিত তহবিলের একটি অংশ কক্সবাজারে ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, কনফিডেন্স ডরিন পাওয়ার লিমিটেডে ইক্যুইটি বিনিয়োগ ও ঋণের একাংশ পরিশোধে ব্যবহার করবে কোম্পানিটি।
বর্তমানে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসির বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৩৯৩.১৬ মেগাওয়াট। আইপিওর অর্থ বিনিয়োগে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে এর সঙ্গে ১৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতা যোগ হবে। তবে ফার্নেস তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তির মেয়াদ ২০২৯ সালে শেষ হয়ে যাবে। সরকার চুক্তি নবায়ন করলে সেগুলো বহাল থাকবে, নইলে তা বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যদিকে কোম্পানিটি আরও কয়েকটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরকার আহুত দরপত্রে অংশ নিচ্ছে। বরাদ্দ পেলে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতায় নতুন সংযোজন হবে।
সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সঃ
প্রসপেক্টাসের তথ্য অনুসারে, সর্বশেষ বছরে (২০২৫-২০২৬) সমন্বিতভাবে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি ৪৭৭ কোটি ১০ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। এ সময়ে এককভাবে কোম্পানিটির মুনাফা ছিল ১৫৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। তার আগের বছর সমন্বিত মুনাফা ছিল ৪৮৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
সর্বশেষ বছরে সমন্বিতভাবে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি আয় হয়েছে ৩১ টাকা ৮৩ পয়সা। আগের দুই অর্থবছরে সমন্বিত ইপিএস ছিল যথাক্রমে ৩২ টাকা ৪৩ পয়সা ও ৩১ টাকা ৩৩ পয়সা।
গত ৩০ জুন, ২০২৬ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) ছিল ১৯৩ টাকা ২৩ পয়সা, আগের বছর যা ছিল ১৬১ টাকা ৪৯ পয়সা।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রাধান্য পাচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া বহুমুখীকরন। বর্তমানে কোম্পানিটি শুধু ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছে। আগামী দিনে তারা সৌরবিদ্যুৎ ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে গুরুত্ব দেবে। ইতোমধ্যে কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স ডোরিন পাওয়ার লিমিটেড ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে। কক্সবাজারেও একটি ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে কোম্পানিটি। আরও ২০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুত প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন আছে।

কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি দ্রুততম সময়ে তার বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোতেও মনোযোগ দিচ্ছে। কোম্পানিটি ২০৩৫ সালের মধ্যে তার বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৩৯৩ মেগাওয়াট থেকে ২ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করতে চায়।
বিদ্যুতের উৎপাদন ও চাহিদার পূর্বাভাস
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসির প্রসপেক্টাসে দেওয়া তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে দেশে পিক আওয়ারে (সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময়) বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। বছরে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরলে ২০২৪ সালে চাহিদা বেড়ে হবে ৪০ হাজার ৯১১ মেগাওয়াট। ২০১৫ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল ২১ হাজার ৬৫৮ মেগাওয়াট। এ সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল ৪ হাজার ৫৫৮ মেগাওয়াট। যদি বর্তমানে বেসরকারি খাতের বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা ক্রয়-চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো না হয় তাহলে ২০৪০ নাগাদ উৎপাদনসক্ষমতা কমে দাঁড়াবে ২১ হাজার ২১১ মেগাওয়াট। তাতে উদ্বৃত্তের পরিবর্তে ১৯ হাজার ৭৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি হবে।
সরকার সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবেলায় বেসরকারি খাতে নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমতি দিচ্ছে, যার বড় অংশই হবে সৌরবিদ্যুত ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুত। আর এখানেই নিজেদের সম্ভাবনা দেখছে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি।
শেয়ারের প্রক্ষেপিত মূল্য
বিভিন্ন মেথডের ভিত্তিতে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসির শেয়ারের প্রক্ষেপিত মূল্য নির্ধারণ করেছে এর ইস্যু ম্যানেজার। ডিসকাউন্টেড ক্যাশফ্লো (ডিসিএফ) ভ্যালুয়েশন পদ্ধতি অনুসারে শেয়ারের সম্ভাব্য মূল্য দেখানো হয়েছে ৩১৫ টাকা ৬৮ পয়সা। প্রেফারেন্স টু নেট অ্যাসেটভিত্তিক পদ্ধতি অনুসারে প্রক্ষেপিত মূল্য দেখানো হয়েছে ১৯৩ টাকা ২৪ পয়সা। বিদ্যুৎখাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের মূল্য বিবেচনায় আর্নিংসভিত্তিক (আয়ভিত্তিক) পদ্ধতি অনুসারে প্রক্ষেপিত মূল্য ৫৮২ টাকা ৩৩ পয়সা। এনএভি ভিত্তিক মূল্যায়ন অনুসারে শেয়ারের দাম দাঁড়ায় ১৭৯ টাকা ৫৮ পয়সা।
শেয়ারের ইনডেকেটিভ বা নির্দেশিত মূল্য বাস্তবে কত হবে তা নির্ভর করবে এর নিলাম প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া যোগ্য বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবিত মূল্যের উপর।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.