সরকারি ক্রয় আইন সংস্কার, নাকি বাড়ছে ইচ্ছাধীন সিদ্ধান্তের সুযোগ

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এ নতুন করে পরিবর্তন আনা হয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়। এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা অধ্যাদেশটির খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। সরকারের ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা, সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং ক্রয়প্রক্রিয়াকে আধুনিক করা।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠানটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সংশোধনীতে সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ শ্রেণি, নতুন নিবন্ধিত ব্যক্তি ও নবীন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ, দেশীয় পণ্য ও শিল্পকে অগ্রাধিকার এবং সীমিত দরপত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পণ্য, কাজ ও ভৌত সেবার মূল্যায়নে নির্দিষ্ট অনুপাতভিত্তিক মানদণ্ড যুক্ত করার প্রস্তাব এবং জরুরি জাতীয় প্রয়োজনে বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থার বিধানও রাখা হয়েছে।

সরকারি ক্রয় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

সরকারি ক্রয় শুধু পণ্য, কাজ বা সেবা কেনার প্রক্রিয়া নয়। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোসহ রাষ্ট্রের বড় একটি অংশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরকারি ক্রয় সরাসরি যুক্ত। আর এসব কার্যক্রমে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার বড় অংশই আসে জনগণের করের অর্থ থেকে।

তাই সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহির ঘাটতি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এর সরাসরি আর্থিক প্রভাব পড়ে জনগণের ওপর। অতিমূল্যায়িত দর, নিম্নমানের কাজ, অপ্রতিযোগিতামূলক ক্রয়, অযৌক্তিক মূল্য পরিবর্তন কিংবা দুর্নীতির কারণে যে অর্থ অপচয় হয়, শেষ পর্যন্ত তার দায়ও জনগণের ওপরই পড়ে।

অতীতের গবেষণাগুলোতেও সরকারি উন্নয়নকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক গবেষণায় ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সড়ক ও সেতু-সংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজের কার্যাদেশের অর্থমূল্যের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার হিসাব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে এর পরিমাণ ২৯ হাজার ২৩০ কোটি থেকে ৫০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা।

এই বাস্তবতায় সরকারি অর্থের অপচয় ঠেকাতে একটি স্পষ্ট, প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ ক্রয়ব্যবস্থা অপরিহার্য। তবে শুধু আইন সংশোধন করলেই সেই লক্ষ্য অর্জিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

মূল প্রশ্ন হলো, নতুন বিধানগুলো বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হবে। আইনের ভাষা কতটা স্পষ্ট, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটা সীমাবদ্ধ, মূল্যায়নের মানদণ্ড কতটা বস্তুনিষ্ঠ, সিদ্ধান্তের কারণ কতটা প্রকাশযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কতটা জবাবদিহির মধ্যে থাকবেন—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত সংস্কারের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।

সংস্কারের উদ্দেশ্য বনাম বাস্তব ঝুঁকি

দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং ক্রয়প্রক্রিয়া আধুনিক করার উদ্দেশ্য নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি ক্রয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

তবে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানদণ্ড স্পষ্ট না হলে এখানেই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

একটি দেশে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশীয় শিল্প হিসেবে বিবেচিত হবে? নাকি স্থানীয় মালিকানা, উৎপাদন, মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থানের নির্দিষ্ট শর্ত থাকতে হবে? আমদানিকারক, পরিবেশক, উৎপাদনকারী এবং প্রযুক্তি-সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কীভাবে পার্থক্য করা হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

মানদণ্ড যদি পরিমাপযোগ্য ও যাচাইযোগ্য না হয়, তাহলে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার উদ্দেশ্য বাস্তবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগে পরিণত হতে পারে। এতে স্বার্থের সংঘাত ও পক্ষপাতের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

সীমিত দরপত্র কতটা সীমিত থাকবে

বিশেষায়িত পণ্য, সীমিত সরবরাহকারী বা বিশেষ পরিস্থিতিতে সীমিত দরপত্রের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতার পরিধি স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।

তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেন দরপত্র সীমিত করা হলো, কোন মানদণ্ডে সরবরাহকারী বাছাই করা হলো এবং একই ধরনের যোগ্যতা থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানকে কেন সুযোগ দেওয়া হলো না। এসব সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে নিরীক্ষা বা স্বাধীন পর্যালোচনার আওতায় আনা যাবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সীমিত দরপত্র প্রয়োজনীয় একটি পদ্ধতি হতে পারে। তবে এটি যেন প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার সহজ পথ না হয়ে ওঠে, সে জন্য এর ব্যবহার, অনুমোদন এবং কারণ নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।

একই কথা প্রযোজ্য বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও। জরুরি জাতীয় প্রয়োজনে স্বাভাবিক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে দ্রুত ক্রয় করার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু ‘জরুরি প্রয়োজন’-এর সংজ্ঞা অস্পষ্ট হলে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা ধীরে ধীরে নিয়মিত ক্রয়ের বিকল্প হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।

তাই জরুরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কেন পরিস্থিতিটি জরুরি, কে অনুমোদন দেবেন, কীভাবে সরবরাহকারী নির্বাচন হবে, দামের যৌক্তিকতা কীভাবে যাচাই হবে এবং পরে কে এর পর্যালোচনা করবেন—এসব বিষয় আগেই নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের ঝুঁকি

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা। আইন নিরপেক্ষ ভাষায় লেখা হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে যদি কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ইচ্ছাধীন ক্ষমতা থাকে, তাহলে পক্ষপাত বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একজন কর্মকর্তাকে যদি নির্দিষ্ট মানদণ্ড, প্রমাণ এবং নম্বর প্রদানের সুস্পষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়, তাহলে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। বিপরীতে সিদ্ধান্তের বড় অংশ যদি ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনার ওপর নির্ভর করে এবং সিদ্ধান্তের কারণ যথাযথভাবে নথিবদ্ধ না হয়, তাহলে জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

এ কারণে বিবেচনাধিকার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চেয়ে সেটিকে সুস্পষ্ট সীমার মধ্যে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের লিখিত কারণ, যাচাইযোগ্য তথ্য, যথাযথ নথিপত্র এবং প্রয়োজন হলে স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

ইলেকট্রনিক ক্রয়ব্যবস্থাই কি যথেষ্ট?

সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা স্বচ্ছতা ও অনুসরণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। দরপত্র দাখিল, উন্মুক্তকরণ, যোগাযোগ ও নথিপত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে।

তবে অনলাইনে দরপত্র নেওয়া হলেই পুরো ক্রয়প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ হয়ে যায় না।

কারিগরি বিবরণ কে তৈরি করেছেন, সেটি কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা সরবরাহকারীর সুবিধা করছে কি না, যোগ্যতার শর্ত কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, সীমিত দরপত্রের প্রয়োজন কেন দেখা দিল কিংবা মূল্যায়নকারী কীভাবে নম্বর দিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা নিজে থেকে দিতে পারে না।

অর্থাৎ, ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে; কিন্তু সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেও শক্তিশালী করতে হবে।

কারিগরি শর্তেও থাকতে হবে নিরপেক্ষতা

উচ্চমূল্যের সরকারি ক্রয়ে কারিগরি শর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দরপত্র কাগজে-কলমে সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও কারিগরি বিবরণ যদি এমনভাবে তৈরি করা হয়, যা বাস্তবে একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড, মডেল বা সরবরাহকারীর সঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে মিলে যায়, তাহলে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যেতে পারে।

তাই বড় ধরনের ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড-নিরপেক্ষ কারিগরি বিবরণ, বাজার বিশ্লেষণ, পরিমাপযোগ্য যোগ্যতার শর্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

সিদ্ধান্তের কারণও হতে হবে প্রকাশযোগ্য

স্বচ্ছতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তিসংবলিত সিদ্ধান্ত। কোনো দরদাতা কেন বাদ পড়লেন, কে কোন মানদণ্ডে কত নম্বর পেলেন, কেন একটি দরপত্রকে অন্যটির চেয়ে গ্রহণযোগ্য মনে করা হলো, কেন সীমিত দরপত্রের প্রয়োজন হলো কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেশীয় শিল্প হিসেবে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলো—এসব তথ্য ক্রয় নথিতে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

স্বচ্ছতা শুধু দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তিও যেন পরবর্তীতে যাচাই করা যায়, সেটিই প্রকৃত জবাবদিহির অংশ।

একজন ব্যর্থ দরদাতা, নিরীক্ষক বা পর্যালোচনাকারী কর্তৃপক্ষ যেন ক্রয় নথি দেখে বুঝতে পারেন—কোন তথ্যের ভিত্তিতে, কোন মানদণ্ডে এবং কী কারণে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সক্ষমতাই ক্রয়ব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়াতে পারে।

সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে প্রয়োগে

সরকারি ক্রয় আইনের সংস্কারের উদ্দেশ্য যদি প্রতিযোগিতা বাড়ানো, দেশীয় শিল্পকে সহায়তা করা, ক্রয়প্রক্রিয়া আধুনিক করা এবং অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়, তাহলে আইনটির প্রয়োগেও একই নীতিগুলো প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।

দেশীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তার সংজ্ঞা ও যোগ্যতার শর্ত স্পষ্ট করতে হবে। সীমিত দরপত্র ব্যবহার করা হলে তার কারণ নথিবদ্ধ ও যাচাইযোগ্য হতে হবে। জরুরি ক্রয়ের সুযোগ থাকলে জরুরিতার সীমা নির্ধারণ করতে হবে। আর কর্মকর্তাদের বিবেচনাধিকার থাকলে সেই ক্ষমতার ব্যবহারও পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড ও লিখিত যুক্তির মধ্যে রাখতে হবে।

সবশেষে, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার প্রকৃত সংস্কার শুধু নতুন বিধান যুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সাফল্য নির্ভর করবে সিদ্ধান্ত কতটা বস্তুনিষ্ঠ, প্রতিযোগিতা কতটা উন্মুক্ত, নথিপত্র কতটা যাচাইযোগ্য এবং অনিয়ম হলে দায় নির্ধারণ ও প্রতিকার কতটা কার্যকর—তার ওপর।

জনগণের অর্থে পরিচালিত সরকারি ক্রয়ে তাই সংস্কারের পাশাপাশি শক্তিশালী জবাবদিহি, স্বাধীন পর্যালোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছ কাঠামো নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.