তেল থেকে ব্যাংকিং—ইরানকে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রের বহুমুখী কৌশল

ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার পর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই এখন ছড়িয়ে পড়ছে অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও। হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব কমানো, ইরানের তেল আয়ে চাপ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে দেশটিকে আরও বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে তেহরানকে দীর্ঘমেয়াদি চাপে রাখার পথে এগোচ্ছে ওয়াশিংটন।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট—ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদগুলোর একটি, হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেওয়াও এখন মার্কিন নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানও দেখিয়ে দিচ্ছে, চাপের মুখে সহজে পিছু হটার সম্ভাবনা নেই।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ইরানে নতুন করে হামলা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের হামলার চেষ্টার জবাব হিসেবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে।

মার্কিন বাহিনীর হামলায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক স্থাপনা, মাইন পাতা ও যোগাযোগ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু বিমান হামলা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ে সীমাবদ্ধ নেই। বরং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক চাপই এখন সংঘাতের অন্যতম প্রধান ফ্রন্ট হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই জলপথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয় এবং তার প্রভাব দ্রুতই তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নির্ভরতা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। বিকল্প পাইপলাইন ও স্থলপথে তেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এই জলপথের কৌশলগত গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।

এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করছে না; বরং তেহরানের অন্যতম বড় কৌশলগত সুবিধা—হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান—কেও দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

সামরিক অভিযানের পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার ইঙ্গিতও দিয়েছেন বেসেন্ট। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানোই এর অন্যতম লক্ষ্য।

সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দুবাইয়ের একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর আরও কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এ ধরনের পদক্ষেপ কার্যকর হলে ইরানের জন্য শুধু তেল রপ্তানি নয়, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহার, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিচালনাও আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তবে এখানে বড় প্রশ্ন হলো—ইরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন কতটা কঠোর পদক্ষেপ নেবে। ইরানের তেল ও অন্যান্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় এই বিষয়টি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কৌশলের অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের জবাবে ইরানও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আরও ‘ধ্বংসাত্মক’ জবাব দেওয়া হবে।

ইরান জর্ডানের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি করেছে। জর্ডানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে এবং আরও তিনটি জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়েছে।

কুয়েত ও বাহরাইনও ইরানের হামলা মোকাবিলায় তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার কথা জানিয়েছে।

তবে ইরানের হামলা ও এতে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে দেশটির দেওয়া সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত দৃশ্যমান হয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। মঙ্গলবার মার্কিন হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ফিউচার ৯৪ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা আরও বাড়লে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, এই জলপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে এশিয়ার তেলনির্ভর অর্থনীতিগুলো এ ধরনের সংকটে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সরবরাহ কমে গেলে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি জাহাজভাড়া, বিমা ব্যয় ও পরিবহন খরচও বেড়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতিতেও।

ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন আর শুধু দুই দেশের সামরিক শক্তির লড়াই নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল।

ওয়াশিংটন যদি বিকল্প জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলে হরমুজের ওপর আন্তর্জাতিক নির্ভরতা কমাতে পারে, তাহলে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে ইরান যদি হরমুজকে ঘিরে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করতে পারে, তাহলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের ওপর নয়—বিশ্বের তেলনির্ভর অর্থনীতিতেও পড়বে।

এ কারণে আগামী দিনগুলোতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি তেলের বাজার, হরমুজ প্রণালি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলের আসল লড়াই হয়তো একই সঙ্গে চলছে ক্ষেপণাস্ত্রের আকাশে, হরমুজের জলপথে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির মাটিতে।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.