জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার জনস্বার্থ ও জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং কোনো পরিস্থিতিতেই সেই পথ থেকে সরে যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই বিএনপির প্রধান লক্ষ্য। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। তবে জনগণের স্বার্থে আন্তরিকভাবে কাজ করলে মানুষ সেই সংকট বুঝতে পারে এবং তা মোকাবিলায় সরকারের পাশে থাকে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন রিজভী।
বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নানা নিপীড়ন, নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অবস্থান থেকে সরে যাননি। জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা বাস্তবায়নে তিনি শেষ পর্যন্ত দৃঢ় ছিলেন।
রিজভী বলেন, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে রেখে খালেদা জিয়া তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করেছেন। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম একপর্যায়ে বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সেই আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ আরও বাড়ে এবং তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ও প্রতিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তার ভাষায়, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতনের যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
খালেদা জিয়ার অবর্তমানে তার রাজনৈতিক আদর্শ সামনে রেখে বিএনপি এগিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন রিজভী। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চেতনা এবং খালেদা জিয়ার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক আদর্শ এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে রিজভী বলেন, অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে সরকার গঠনের পর এখন উন্নয়ন, উৎপাদন ও জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ চলছে। হার্ভেস্ট কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের সামাজিক সুরক্ষা ও জীবনযাত্রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে সরকার কাজ করছে এবং এ ক্ষেত্রে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ এলেও সেগুলো মোকাবিলা করা হবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়েও কথা বলেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বসে নেই। গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি নিয়ে দেশে আসার পথে একাধিক জাহাজে বোমা হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রিজভী আরও বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দের পাশাপাশি গ্যাস সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। মহেশখালীতে থাকা টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে এবং তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গণতন্ত্র, সামাজিক সুরক্ষা, উন্নয়ন ও উৎপাদনের যে অঙ্গীকার রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে এসব কর্মসূচি আরও বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
দল ও সরকারের সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দল ও সরকার পৃথক দুটি সত্তা হলেও তারা পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। বিএনপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছে। ফলে দলের যোগ্য নেতাদের রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা স্বাভাবিক।
রিজভী বলেন, দলের নেতা-কর্মীরা তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করবেন। দল তার সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করবে এবং সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। দুটি ক্ষেত্রের দায়িত্ব আলাদা হলেও তাদের লক্ষ্য হবে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
বিএনপির নেতাদের একই সঙ্গে দলীয় ও সরকারি দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা দলের বিভিন্ন পদে রয়েছেন, তারা সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে বিএনপির যেসব নেতা সরকারের মন্ত্রিত্বে রয়েছেন, তারাও তাদের সাংগঠনিক অবস্থান অনুযায়ী দলীয় দায়িত্ব পালন করবেন। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো কারণ নেই।
দীর্ঘ আন্দোলনের পর ক্ষমতায় এসে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জরিপ হয়েছে। তবে সরকারের মূল দায়িত্ব হলো সততার সঙ্গে জনগণের জন্য কাজ করা। জনগণের স্বার্থে আন্তরিকভাবে কাজ করতে গেলে নানা সংকট তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই সংকট যদি সরকারের নিজেদের সৃষ্টি না হয়, তাহলে জনগণ তা বুঝতে পারে।
তিনি বলেন, সংকটের সময়ে সরকার কতটা আন্তরিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, জনগণ মূলত সেটিই দেখতে চায়। বর্তমান সরকার জনগণের স্বার্থে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে দাবি করে তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকার জনকল্যাণের পথ থেকে বিচ্যুত হবে না।
রিজভী বলেন, বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও দেশ গঠনের আদর্শ এবং খালেদা জিয়ার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বিএনপি দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করবে। নানা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই জনগণের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.