নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব: আইনমন্ত্রী

নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকার গঠনমূলক সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে। সমালোচনা ও পরামর্শের মধ্য দিয়েই সংস্কারের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সরকার সামনে এগিয়ে যেতে চায় এবং সংস্কারের যৌক্তিক জায়গায় পৌঁছাতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’- শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, সরকারের সমালোচনা করার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে এবং এই অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মসূচি পালন করবে এবং সরকারের সমালোচনা করবে- এটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। সমাজে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারে। মতপ্রকাশের কারণে লেখক, সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে হয়রানি বা গ্রেপ্তারের অতীত সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আইন ও নীতিমালার ক্ষেত্রে সরকার কোনো বিষয়কে চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় মনে করে না। কোনো আইন বাস্তবে প্রয়োগের পর যদি দেখা যায় সেখানে সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে, তাহলে সংশোধনের জন্য সরকার উন্মুক্ত থাকবে। আইন মানুষের প্রয়োজনেই প্রণীত হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা সংশোধন করা যায়।

মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এসব আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। গুমের ঘটনাকে সাধারণ অপরাধ এবং ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য করে বিচারিক এখতিয়ার নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা প্রকৃত তথ্য গোপন করলে বা ভুল তথ্য দিলে জবাবদিহির প্রশ্নও আসবে। এর মাধ্যমে দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদকে সামনে রেখে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে যেকোনো সংশোধন করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন বিচারিক সিদ্ধান্তেও সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছে। বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনের বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জুলাই সনদের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের প্রয়োজন রয়েছে। সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। যেকোনো যৌক্তিক প্রস্তাব ও মতামত বিবেচনা করে সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার সুযোগ রয়েছে। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি এ প্রক্রিয়ায় গঠনমূলকভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকর ভারসাম্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংবিধানের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত বিধান এবং বিচার বিভাগের বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দক্ষতা ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করা।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বিচারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আইনানুগ প্রক্রিয়া ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিচারিক আদেশের বিষয়ে আপত্তি থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আপিল বা রিভিশনের সুযোগ রয়েছে। বিচারিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক ও আইনানুগ প্রক্রিয়া সমুন্নত রাখার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রুততম সময়ে নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। তবে সরকারের লক্ষ্য হলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সংস্কারের মাধ্যমে একটি কার্যকর ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এ কারণে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা ও যৌক্তিক পরামর্শকে স্বাগত জানানো হবে।

তিনি বলেন, আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই, পিছনে ফিরতে চাই না। সংস্কারের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.