গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধান হওয়ার নয়: অর্থমন্ত্রী
দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধান হওয়ার নয় বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার কাজ করছে, তবে বিদ্যমান সংকট এক মাসে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশাবিষয়ক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান সমস্যা সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। তবে সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে এবং এ ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে অগ্রগতি হবে।
এদিকে চলমান গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), কিন্তু সরবরাহ দীর্ঘদিন ধরেই এর চেয়ে অনেক কম।
গত ১১ আগস্ট পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের প্রয়োজনীয় গ্যাসের মাত্র ২৯ শতাংশ এবং সার কারখানাগুলো প্রায় ৩৮ শতাংশ গ্যাস পেয়েছে বলে সিপিডির এক আলোচনায় উঠে এসেছে। সিপিডি বলছে, এই ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কার্যক্রমে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে। আগস্টের শুরুতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছিও পৌঁছেছিল।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যেও দেখা যায়, আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪২ শতাংশের বেশি গ্যাসভিত্তিক। ফলে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে। ১৮ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৪২০ এমএমসিএফডিতে উঠেছিল, যার মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছে প্রায় ৮০০ এমএমসিএফডি। তবে জাতীয় চাহিদার তুলনায় এ সরবরাহ এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও শিল্পকারখানাগুলো এখনো স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকায় উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অন্যদিকে জ্বালানি খাতের সাম্প্রতিক সংকটকে শুধু সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সিপিডির সাম্প্রতিক আলোচনায় বলা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অবশিষ্ট দেশীয় গ্যাসের মজুত ২০৩১ সালের দিকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। তাই নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, অবকাঠামো উন্নয়ন ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আন্তর্জাতিক বাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান সংকটে এলএনজি ও জ্বালানি পরিবহনে ঝুঁকি বাড়ায় দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলো বাড়তি মূল্য ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির বহুমুখীকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তা না হলে বর্তমান সংকট সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে এলেও ভবিষ্যতে গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি আরও বড় আকার নিতে পারে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.