ওপেকের প্রভাব কমছে, কৌশলগত শক্তিতে পরিণত হয়েছে চীন

জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা চীনের অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা। তবে এই দুর্বলতাকেই কৌশলগত শক্তিতে পরিণত করেছে দেশটি।

দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের বড় অর্থনৈতিক বিস্ময় হলো, হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখনো তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পাঁচ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে গত ৩০ এপ্রিল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে উঠেছিল। একপর্যায়ে বাজারে অপরিশোধিত তেলের সাময়িক উদ্বৃত্তও দেখা দেয়। ফলে তেল আমদানিকারকদের এখনো বড় ধরনের সংকটে পড়তে হয়নি।

এর পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে চীনের। ইরানের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যতটা চাপ দিতে পারতেন, চীনের কারণে ততটা সম্ভব হয়নি।

ইরান যখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে, তখন প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উপসাগরে আটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিমাণের দিক থেকে এটি বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্রুত পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল ভিন্ন পথে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানসহ ধনী দেশগুলো কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ে। ফলে বাজারে সরবরাহ বাড়ে।

তবে ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে চীন। দেশটি প্রতিদিন অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে ৫৫ লাখ ব্যারেলে নিয়ে আসে। মজুত থেকে তেল ছাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি সীমিত করা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিয়ন্ত্রণ—দুইভাবেই চীন এ কাজ করেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বড় ধরনের ধাক্কা সামলাতে সক্ষম হয়েছে দেশটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো বাজার এভাবে একটি দেশের একক নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের। চীন এর আগেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজের প্রভাব ব্যবহার করেছে। বার্লি আমদানিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হওয়া থেকে শুরু করে বিরল মৃত্তিকা পরিশোধনে শীর্ষ অবস্থান—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের বাজার সক্ষমতা রয়েছে। সমালোচকদের ওপর চাপ তৈরি করতে বা অপছন্দের দেশগুলোর ব্যয় বাড়াতে চীন এই ক্ষমতা ব্যবহার করেছে।

তবে ইরান যুদ্ধে দেখা গেছে, বড় কোনো ক্রেতা যখন নিজের বাজারক্ষমতা ব্যবহার করে, তখন তেল আমদানিকারক অন্য দেশগুলোও লাভবান হতে পারে।

ওপেকের প্রভাব কমছে

দীর্ঘদিন ধরে তেলের বাজারের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি ছিল পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক। রাশিয়াসহ মিত্রদের নিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে এই জোট বিশ্বের অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করত। সাধারণত উৎপাদন কোটা বা সরবরাহ কমিয়ে ওপেক তেলের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি রাখার চেষ্টা করে। তবে কখনো কখনো প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজার থেকে সরাতে সৌদি আরবকে বেশি তেল উৎপাদনের সুযোগ দেওয়ার মতো উল্টো কৌশলও নিয়েছে জোটটি।

ওপেকের এই বাজার নিয়ন্ত্রণকে বিশ্ব অর্থনীতিতে একধরনের কর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ওপেকের কর্মকাণ্ডের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন বা ৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অবশ্য বিভিন্ন গবেষণায় ক্ষতির হিসাবের ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে।

চীনের কৌশল এ বছর ভিন্ন ফল দিয়েছে। দাম কম থাকার সময় তারা বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করেছে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কিছুটা প্রভাব পড়লেও সেই মজুতের কারণে এবার তেলের দাম সেভাবে বাড়েনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

চীন যদি ভবিষ্যতেও তেলের দামের উত্থান-পতনের রাশ টানতে পারে, তাহলে অনেকের জীবন সহজ হতে পারে। আমদানিকারক দেশ থেকে বিনিয়োগকারী—সবাই এতে লাভবান হবেন। কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করার চেষ্টা ঝুঁকিপূর্ণ। বাজারে যারা কারসাজি করেন, তারা বিষয়টি জানেন। সবার ভাগ্য ভালো, চীন নিজেই এই ঝুঁকি বহন করছে।

তবে তেলের বাজারে ক্ষমতার ভারসাম্য আবার বদলাতে পারে। উপসাগরীয় সংকট কেটে গেলে কিছু সময়ের জন্য অপরিশোধিত তেলের বড় ধরনের উদ্বৃত্ত তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতির পূর্বাভাস আগেই দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে যুদ্ধের পর ওপেক আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। একসময় এই জোটের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক দেশ ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। গত মে মাসে তারা ওপেক থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্য সদস্যদের মধ্যেও উৎপাদন বাড়ানোর আগ্রহ রয়েছে।

দীর্ঘ মেয়াদে তেলের সরবরাহ কমার গতি চাহিদার তুলনায় বেশি হতে পারে। তখন তেলের বাজারে চীনের প্রভাবও কমে আসতে পারে।

তেলক্ষেত্রের মজুত কমতে থাকায় প্রতি দুই বছরে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন সৌদি আরবের এক বছরের উৎপাদন সক্ষমতার সমপরিমাণ কমে যাচ্ছে। সে কারণে ২০৩০ সালের পর যে ঘাটতি হবে, তা পূরণে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগও পর্যাপ্ত নয়। ফলে তেলের বাজারে ওপেকের ক্ষমতা আবার বাড়তে পারে। কারণ নতুন বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করার সামর্থ্য এখনো উপসাগরীয় দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলোর রয়েছে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহে তাদের অংশও বাড়বে।

চীনে তেলের চাহিদা কমছে

অন্যদিকে চীনের তেলের চাহিদা কমে যেতে পারে। দেশটিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে চীন হয়তো আগের মতো বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করবে না। তেলের বাজারে উদ্বৃত্ত দেখা দিলে তারা কম তেল কিনবে এবং সংকটের সময়ও আমদানি কমানোর গতি কমাবে। ফলে বাজারের বড় ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রে চীন এবার যে ভূমিকা রেখেছে, তা ভবিষ্যতে কমে যেতে পারে।

এদিকে নিউইয়র্ক টাইমসের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের হাতে কিছু বিকল্প রয়েছে। দেশটিতে বিশাল কয়লার মজুত রয়েছে। এই কয়লা ব্যবহার করে তেলজাত পণ্যের পরিবর্তে বিভিন্ন রাসায়নিক উৎপাদন করা যায়। এ ছাড়া দেশটির বিদ্যুতের বড় অংশ আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারও এখন চীন। সেই সঙ্গে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক। বিপুলসংখ্যক মানুষ ট্রেনে ভ্রমণ করেন। ফলে পরিবহন খাতে তেলের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম।

ইরান যুদ্ধের সময় চীন মূলত নিজেদের স্বার্থেই তেলের বাজারে সুরক্ষা দিয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক হিসেবে চীন তেল আমদানি কমিয়ে বৈশ্বিক বাজারের চাপ কমিয়েছে। আবার পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে সরবরাহ কমিয়েছে। তাদের মজুতের পরিমাণ গোপন থাকায় বাজার বুঝতে পারছে না, ভবিষ্যতে চীন কতটা তেল সরবরাহ করতে পারবে। ফলে তেলের বাজারের ভবিষ্যৎ আচরণ কেমন হবে, তা অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে চীনের এই হস্তক্ষেপের বদৌলতে অন্য তেল আমদানিকারক দেশগুলো কিছুটা সময় পেয়েছে। তাদের উচিত, এই সময় কাজে লাগিয়ে তেলের সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা। সবচেয়ে বড় কথা, তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো।

কোনো স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের ওপর নির্ভরতা এড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, প্রথমেই তেলের প্রয়োজন কমিয়ে আনা।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.