দেশের তৈরি পোশাক খাতে টেকসই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সংস্থাটি বলছে, মোট ব্যয়ের প্রায় ৭১ শতাংশ খরচ হবে দেশের শীর্ষ ২৫ শতাংশ বড় কারখানাগুলোতে। সঠিক মডেল অনুযায়ী যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত শক্তি সাশ্রয় করা সম্ভব বলেও মনে করে তারা।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ অন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিকার্বনাইজেশন’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে উপস্থাপিত এক গবেষণায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট সামি মোহাম্মদ।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, বিজিএমইএর সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার বিদ্যা অমৃত খান ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ শাহরিয়ার উপস্থিত ছিলেন।
সূচনা বক্তব্যে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি সংকটে বিকল্প বলতে সবাই এখন এলএনজির কথা বলছি, যেটা আসলে বড় কোনো সমাধান নয়। সাময়িক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অবশ্যই এই ব্যয়বহুল জ্বালানি দিয়ে সম্ভব নয়। সময় এসেছে বিকল্প জ্বালানির ওপর ভিত্তি করে আমাদের শিল্পকারখানা বা অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো গড়ে তোলার। যেমন শিল্পকারখানাগুলোতে বিদ্যুতের যে চাহিদা রয়েছে, তার একটি অংশ যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়।
তিনি বলেন, গাড়িতে ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে ইলেকট্রিক ভেহিকেলে যাওয়া এবং শিল্প ও কৃষি উৎপাদনে ডিজেলের বিকল্প হিসেবে আরও বেশি সৌরভিত্তিক সেচব্যবস্থা বা বৈদ্যুতিক সেচব্যবস্থার দিকে যাওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমাধানের কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এই মুহূর্তে সরকারের জ্বালানি খাতের জন্য একটি জরুরি প্রতিক্রিয়া দল করা দরকার, যারা জরুরি ভিত্তিতে সমাধানগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাবে। সরকার সবকিছু প্রকিউরমেন্টে করুক, কিন্তু বিষয়টি দ্রুত করা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। স্বাভাবিক সময়ের মতো যাতে এগুলো না এগোয়, সে জন্য এই মুহূর্তে একটি জরুরি প্রতিক্রিয়া দল দরকার।
সবকিছু মিলিয়ে দেশের শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হলে মূল কাজটি তৈরি পোশাক খাত দিয়ে শুরু করতে হবে বলে মনে করেন এই গবেষক।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ৩৫০টি পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত সিপিডির গবেষণায় বলা হয়েছে, যন্ত্রপাতির সংখ্যা বাড়ালে শক্তির ব্যবহার কমে না, বরং বেড়েছে। গার্মেন্টস খাতে জ্বালানি ব্যয় কমাতে কারখানায় টেকসই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এটি নিশ্চিত করতে গার্মেন্টস খাতের ১৫ হাজার ২টি যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করা জরুরি, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। আর ৫০ শতাংশ আধুনিকায়নে ব্যয় হবে ৬ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা।
গবেষণায় দেখা গেছে, বড় কারখানার মধ্যে যাদের গড়ে ২ হাজার ১০৫ জনের বেশি কর্মী রয়েছে, মোট ব্যয়ের ৭০ দশমিক ৯ শতাংশই তাদের জন্য প্রযোজ্য। প্রতি কারখানায় গড়ে ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নে খরচ হবে ৭৩ দশমিক ১ কোটি টাকা। অন্যদিকে সবচেয়ে ছোট কারখানায়, যেখানে গড়ে ১১১ জন শ্রমিক রয়েছেন, মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ খরচের মাধ্যমে শক্তি সাশ্রয় করা সম্ভব।
অন্যদিকে কাটিং বিভাগে মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ মেশিন থাকলেও প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ সাশ্রয় সম্ভব। সেলাই বিভাগে ৮৫ শতাংশ মেশিন থাকলেও এগুলো প্রযুক্তিগতভাবে অপরিহার্য হওয়ায় সাশ্রয়ের হার ২ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে ডাইং ও ওয়াশিং বিভাগে গ্যাসের ব্যবহার বেশি হওয়ায় সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে শতভাগ কার্বন নির্গমন কমানো সম্ভব নয়। আর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে কারখানার বিদ্যুৎ খরচ ৪ দশমিক ৪ থেকে ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
অনুষ্ঠানে সিপিডির পক্ষ থেকে ছোট ও মাঝারি কারখানার প্রযুক্তি পরিবর্তনের সুবিধার্থে ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ এবং কারখানাগুলোতে কার্যক্ষমতাভিত্তিক এনার্জি অডিট বাধ্যতামূলক করার ওপর তাগিদ দেওয়া হয়।
গবেষণায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ১৫ দশমিক ৪ শতাংশের জন্য দায়ী। এই খাতে কার্বন নির্গমন কমানোর খরচ মেটাতে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সিপিডি।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.