বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর যৌথ উদ্যোগে দেশের শিল্পখাতের জরিপ নিয়ে একটি বিভাগীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সিলেটের রোজ ভিউ হোটেলে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় সিলেট বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য অংশীজন অংশ নেন। জরিপটি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, এর পরিধি ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা, সম্ভাবনাময় খাত ও বিনিয়োগের সুযোগ-চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা এবং তথ্য যাচাইয়ে সিলেটের অংশীজনদের সহযোগিতা নেওয়াই ছিল কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য।
জরিপটি বিডার নেতৃত্বে, এডিবির অর্থায়নে এবং সানেম-এর কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীরা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন তা চিহ্নিত করা, এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করা এবং একটি নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ তৈরি করা। এই ডেটাবেজ বিনিয়োগকারীদের সহায়তার পাশাপাশি সরকারের কার্যকর নীতি প্রণয়নেও কাজে আসবে।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন। প্রধান অতিথি ছিলেন বিডার নির্বাহী সদস্য মো. হুমায়ুন কবির। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মো. মোশিউর রহমান এবং বিডার মহাপরিচালক জীবন কৃষ্ণ সাহা রায়। অতিথি ছিলেন সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি লুবানা ইয়াসমিন শম্পা। এডিবি বাংলাদেশের পাবলিক সেক্টর ইকোনমিস্ট তাসনিম আলম এডিবির প্রতিনিধিত্ব করে বক্তব্য দেন।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান কর্মশালার সূচনা করেন এবং জরিপের পটভূমি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া এবং বিনিয়োগ ও নীতি প্রণয়নে সহায়ক একটি নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ তৈরি করাই জরিপটির লক্ষ্য।
সানেমের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জুবায়ের হোসেন জরিপের পদ্ধতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বলে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি যাচাই করতে বিদেশি মালিকানাধীন ও যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ জরিপ এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ করা হবে। এতে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, খাত, কার্যক্রম ও অবস্থানসহ বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
এডিবি বাংলাদেশের পাবলিক সেক্টর ইকোনমিস্ট তাসনিম আলম বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ জরিপের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এ কারণে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট উত্তরণ পরিকল্পনা প্রয়োজন। তিনি সিলেটের পর্যটন খাতের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সুযোগগুলো চিহ্নিত ও কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
সিলেট উইমেন চেম্বারের সভাপতি লুবানা ইয়াসমিন শম্পা স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা সাধারণত পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা করতে চান, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে তাদের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে সিলেটে নারীসহ রপ্তানিমুখী উদ্যোক্তার ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি কৃষি খাতের সঙ্গে সিলেটের পর্যটন শিল্পকে যুক্ত করার মতো উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি যাচাই করা আঞ্চলিক তথ্যের অভাব নতুন শিল্প স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করছে বলে জানান। তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে চেম্বারের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
বিডার মহাপরিচালক জীবন কৃষ্ণ সাহা রায় বলেন, নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডেটাবেজের অভাব পূরণে এই জরিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ উন্নত দেশের পথে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে LDC উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগাম পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে উন্মুক্ত বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা আর না থাকায় নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। বিনিয়োগ পরিবেশ আরও সহজ করতে বিডার ওয়ান স্টপ সার্ভিস (OSS) শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। জরিপের ফলাফল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগ নিশ্চিত এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক হবে বলে তিনি জানান।
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মোশিউর রহমান বলেন, প্রচলিত গবেষণার তুলনায় এই জরিপ সিলেটের শিল্প পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ও সামগ্রিক ধারণা দেবে। সিলেটে অনেক কাঁচামালভিত্তিক শিল্প রয়েছে, যেগুলো ব্যাপকভাবে পরিচিত নয়। জরিপের মাধ্যমে এসব সম্ভাবনাময় সম্পদ ও শিল্পকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এর ফলে সিলেটের স্থানীয় অর্থনীতি যেমন উপকৃত হবে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিও লাভবান হবে।
বিডার নির্বাহী সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, অতীতে বিডার তথ্যের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের অসঙ্গতি, নিবন্ধনের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে পর্যাপ্ত অনুসরণ না করা এবং প্রকৃত সক্রিয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সম্পর্কে অসম্পূর্ণ তথ্যের সমস্যা ছিল। ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করতে OSS-এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবাগুলো আরও সমন্বিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, LDC উত্তরণের প্রস্তুতি, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক শিল্পায়নের মাধ্যমে নতুন সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। সিলেটের SME খাতের সঙ্গে কাজ করা এবং স্থানীয় উৎপাদনকে কাজে লাগিয়ে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (agro-processing zone) গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তিনি তুলে ধরেন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে সমস্যায় পড়েন। এমনকি বিদেশি দূতাবাসগুলোর কাছেও দেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে কার্যকর তথ্য অনেক সময় থাকে না। এ সমস্যা সমাধানে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সহজলভ্য ডেটাবেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি জরিপের তথ্য সংগ্রহে জেলা প্রশাসনের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
কর্মশালার পর অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে একটি উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিলেটের শিল্পখাতের বর্তমান পরিস্থিতি ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা যেসব সমস্যার কথা তুলে ধরেন, তার মধ্যে রয়েছে- কৃষি ও শিল্প যন্ত্রপাতির জন্য স্বল্পসুদের ঋণের অভাব। রপ্তানিমুখী বিকল্প পণ্য উৎপাদনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের ঘাটতি। বিনিয়োগ তহবিল যথাযথভাবে বিতরণ না হওয়ার অভিযোগ। খাতভিত্তিক বিনিয়োগের ঘাটতি। বন্দর ও সিলেটের মধ্যে দুর্বল সড়ক যোগাযোগ, যার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। স্থানীয়ভাবে পণ্য সংযোজন বা আমদানি বিকল্প শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উচ্চ ব্যয়। শিল্পকারখানা থাকলেও দক্ষ স্থানীয় জনবলের ঘাটতি।
বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়মের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া। SME খাতে কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত নানা সমস্যা। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা মৎস্য শিল্পের আরও উন্নয়ন এবং সিলেটে সৌরবিদ্যুৎ শিল্প গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.