ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে পারস্য উপসাগরের খার্গ দ্বীপে অবস্থিত ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র। বুধবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম।
উল্লেখ্য, ইরান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ইরানের খনিগুলোতে মজুত তেলের পরিমাণ কমপক্ষে ২০৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বের মোট মজুদের প্রায় ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ। ভেনেজুয়েলা ও সৌদি আরবের পর এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেলের মজুদ। ইরানের অর্থনীতি অনেকাংশে তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল এবং এর সিংহভাগ, প্রায় ৯০ শতাংশ, তেল চীনে রপ্তানি করা হয়।
আর পারস্য উপসাগরের ইরানের উপকূল থেকে ২৬ কিলোমিটার এবং হরমুজ প্রণালি থেকে ৪৮৩ কিলোমিটার উত্তরপশ্চিমে অবস্থিত ৫ বর্গমাইল আয়তনের খার্গ দ্বীপ ইরানের জ্বালানি বাণিজ্যের ‘প্রাণ’ হিসেবে পরিচিত। দেশটির ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং তরল গ্যাসের চালান এই দ্বীপ থেকেই বহির্বিশ্বে যায়। কৌশলগতভাবেও এ দ্বীপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মূলত খার্গ দ্বীপের ডিপো বা সংরক্ষণাগারগুলো থেকেই বহির্বিশ্বে যায় ইরানের তেল ও তরল জ্বালানি গ্যাস। খনি থেকে তেল উত্তোলন এবং গ্যাস খনিগুলো থেকে সংগৃহীত গ্যাস তরলীকৃত করার পর ইরানের বন্দরগুলো থেকে সেই তেল ও তরলীকৃত গ্যাস প্রথমে যায় ইরানের বন্দরগুলোতে। তারপর সেখান থেকে এই তেল ও তরলীকৃত গ্যাস মজুত করা হয় খার্গ দ্বীপের ডিপো বা টার্মিনালগুলোতে। সেখান থেকে তেল ও গ্যাস বৈশ্বিক বাজারে নিয়ে যায় ইরানি ট্যাংকারগুলো।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে অভিযান শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি জাহাজ চলাচলে অবরোধ জারি করে তেহরান। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের সামুদ্রিক বন্দরগুলোতে অবরোধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্রও।
তারপর পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ভিত্তিতে গত ১৭ জুন ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষর করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর হরমুজ থেকে অবরোধ তুলে নেয় ইরান। ইরানের বন্দরগুলো থেকেও প্রহরা তুলে নেয় মার্কিন নৌবাহিনী।
কিন্তু ১৩ জুলাই ইসলামাবাদ চুক্তি থেকে বের হয়ে যায় ইরান এবং হরমুজ প্রণালিতে ফের অবরোধ জারি করে। একই সময়ে ইরানের বন্দরগুলোতে ফের পাল্টা অবরোধ জারি করে যুক্তরাষ্ট্রও।
আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধের কারণে তেল ও গ্যাসের উত্তোলন স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে ইরান। ফলে খার্গ দ্বীপের টার্মিনালগুলোতেও নতুন কোনো পণ্য চালান আসছে না।
খার্গ দ্বীপে তেল ও গ্যাসের ৩টি বড় টার্মিনাল আছে ইরানের। উইন্ডওয়ার্ডের কর্মকর্তারা মার্কিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাদের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, টানা ২২ দিন ধরে খার্গ দ্বীপের ৩ টার্মিনালের কোনোটিতে নতুন চালান আসেনি।
ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে তেল-গ্যাসের চালান না আসায় রপ্তানি চালানও থেমে আছে। গত ৩১ জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত খার্গ দ্বীপ থেকে নতুন কোনো রপ্তানি চালান যায়নি এবং দ্বীপের বন্দরে বর্তমানে ১৭টি ইরানি ট্যাংকার নোঙ্গর করা অবস্থায় আছে।
১৩ জুলাই ইরান ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পর প্রথম দিকে অবশ্য ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ খানিকটা শিথিল ছিল, ফলে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রহরা ফাঁকি দিয়ে ইরান তেলের রপ্তানি অব্যাহত রাখতে পেরেছিল। ইরানের গণমাধ্যমগুলোও রপ্তানির এই অব্যাহত অবস্থাকে ‘সাফল্য’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল।
কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধও কড়া হয়েছে। ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, গত ১৪ দিনে একটি জাহাজও ইরানের কোনো বন্দর ছেড়ে খার্গ দ্বীপে যেতে পারেনি।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.