তালাকের অজুহাতে সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না: হাইকোর্ট

তালাকের অজুহাত দেখিয়ে স্ত্রী-নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ ও দেনমোহরের বাস্তবায়ন বন্ধ হবে না মর্মে হাইকোর্টের রায় প্রকাশিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) মামলার রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান রায় প্রকাশের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রায়ে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহরের ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। একই সঙ্গে নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কোনোভাবেই মা-বাবার তালাক সংক্রান্ত বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি শিশুর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিচারপতি আবদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন একক হাইকোর্ট বেঞ্চের সাক্ষরের পর রায়টি প্রকাশিত হয়েছে।

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, শুধুমাত্র একটি নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে, এই কারণে পূর্বে প্রদত্ত চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। কোনও সক্ষম আদালত ডিক্রি স্থগিত না করা পর্যন্ত সেটি কার্যকর থাকবে এবং এক্সিকিউশন কোর্ট তা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। যে তালাক আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় বা কার্যকর নয়, সেই তালাকের কোনও আইনগত কার্যকারিতা নেই। এমন তালাক বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটায় না এবং ভরণপোষণ বা দেনমোহরের ডিক্রি বাস্তবায়নের পথে কোনও আইনি বাধাও সৃষ্টি করতে পারে না।

রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন, বিবাহ, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং বৈবাহিক অধিকার সম্পর্কিত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের।

নাবালক সন্তানের অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে হাইকোর্ট বলেন, একজন নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের অধিকার একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। মা-বাবার মধ্যে তালাক নিয়ে বিরোধ থাকলেও সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না। একজন পিতা কেবল তালাক সংক্রান্ত বিরোধের অজুহাতে তার সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। এক্সিকিউশন কোর্টের দায়িত্ব কেবল বিদ্যমান ডিক্রি বাস্তবায়ন করা। তারা নতুন করে তালাক বৈধ কিনা কিংবা বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান কিনা- এসব প্রশ্ন বিচার করতে পারে না। ডিক্রির বাইরে গিয়ে নতুন বিরোধ নিষ্পত্তি করার কোনও এখতিয়ার তাদের নেই।

অকার্যকর তালাক প্রসঙ্গে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, যদি পূর্বে দাবি করা তালাক আইনগতভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয় এবং স্বামী সত্যিই বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটাতে চান, তাহলে আইন অনুযায়ী নতুন করে তালাক দেওয়ার সুযোগ তার রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনা পূর্বে প্রদত্ত ডিক্রির অধীনে সৃষ্ট দেনমোহর ও ভরণপোষণের দায় থেকে তাকে মুক্তি দেয় না।

রায়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে আরও সুদৃঢ়ভাবে ব‍্যাখ‍্যা করে হাইকোর্ট বলেছেন- তালাকের আইনগত কার্যকারিতা অবশ্যই আইন অনুযায়ী প্রমাণিত হতে হবে; নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন অধিকার; এবং নতুন মামলা দায়ের করে কোনও চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।

এর আগে ২০১১ সালে এই মামলার বাদী-বিবাদীর বিবাহ সম্পন্ন হয়। পরবর্তীকালে অধস্তন পারিবারিক আদালতে স্ত্রী ও তাদের নাবালক কন্যা সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলায় স্বামী দাবি করেন, তিনি পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। কিন্তু আদালতে তিনি আইন অনুযায়ী সেই তালাক প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন। ফলে পারিবারিক আদালত স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি প্রদান করেন। পরবর্তীকালে নতুন একটি ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করে স্বামী আদালতে দাবি তোলেন, তালাক কার্যকর হয়েছে, তাই ভরণপোষণের ডিক্রির এক্সিকিউশন স্থগিত করার আবেদন করেন। তবে অধস্তন আদালত আবেদনটি খারিজ করলে তার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন জানানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় রায় দিলেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্ট রুল খারিজ করে অধস্তন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন। একই সঙ্গে আদালত স্বামীকে দেনমোহরের বকেয়া এবং স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের সব বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দেন। আদালতে স্বামীর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শহিদুল ইসলাম এবং স্ত্রীর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাকে সহযোগিতা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিলা রহমান জুঁই ও ইফাত হাসান শাম্মি।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.