নিরাপদ বিনিয়োগমাধ্যম হিসেবে সোনার প্রতি আগ্রহ থাকলেও বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সোনায় বিনিয়োগের ধরন বদলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, স্বল্পমেয়াদে সোনার দামে চাপ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক ক্রয় এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এ ধাতুর চাহিদাকে শক্তিশালী রাখবে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধ, সুদহার ও ডলারের শক্ত অবস্থানের কারণে সোনার বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। জানুয়ারিতে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর জুন মাসে সোনার দাম ১২ দশমিক ৭ শতাংশ কমে, যা ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে বড় মাসিক পতন। যুদ্ধ শুরুর পরও কয়েক সপ্তাহ দাম স্থিতিশীল থাকলেও পরে ২০ শতাংশের বেশি কমেছে।
দুবাইভিত্তিক ইকুইটি গ্রুপের মার্কেট ইনসাইটস প্রধান নুরেলদিন আল হাম্মুরি বলেন, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলেই সোনার দাম বাড়বে—এমন কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। তাঁর মতে, স্বল্পমেয়াদে সোনা নগদ অর্থ ও সরকারি বন্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। ডলার শক্তিশালী হওয়া এবং প্রকৃত সুদহার বাড়লে সোনার ওপর চাপ তৈরি হয়, কারণ তখন বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি সিকিউরিটিজে বেশি মুনাফা পান।
তবে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল বলছে, সাম্প্রতিক মূল্য সংশোধন সত্ত্বেও গত এক বছরে সবচেয়ে ভালো পারফর্ম করা সম্পদগুলোর মধ্যে সোনা অন্যতম। সংস্থাটির বিশ্লেষকদের ধারণা, অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে সোনার দাম আবার আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৫০০ ডলারে উঠতে পারে। জে পি মরগ্যানও ২০২৬ সালের তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে যথাক্রমে ৪ হাজার ৩০০ ও ৪ হাজার ৫০০ ডলারের পূর্বাভাস দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, নতুন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সুদহার কমার প্রত্যাশা কিংবা কম দামে কেনার প্রবণতা সোনার দাম আবার বাড়াতে পারে। বিপরীতে অর্থনীতি শক্তিশালী থাকলে এবং বন্ডের সুদ বাড়লে সোনার দাম আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
টিয়ারা জেমস অ্যান্ড জুয়েলারির প্রতিষ্ঠাতা আশীষ বিজয় বলেন, সোনা এখন শুধু নিরাপদ বিনিয়োগ নয়, বরং কৌশলগত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক স্বর্ণ ক্রয়, সার্বভৌম ঋণ নিয়ে উদ্বেগ, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা সোনার দীর্ঘমেয়াদি চাহিদাকে শক্তিশালী করছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১২ মাসেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের মজুত বাড়াতে পারে। বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সোনাকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার প্রকৃত চাহিদার কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়ায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। চীন, ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যে সোনা কেনার প্রবণতা বাড়ছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা ১৯ মাস ধরে স্বর্ণের রিজার্ভ বৃদ্ধি করেছে এবং দেশটির স্বর্ণ আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য সোনায় লেনদেন করলেও এশিয়ার পরিবার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ সংরক্ষণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার কৌশল হিসেবে সোনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক সোনার বাজারে পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.