ইরানের সঙ্গে সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক ‘শেষ’ হয়ে গেছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৬ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই বুধবার অপরিশোধিত তেলের দাম দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ফের শুরু হওয়া এই সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে নতুন করে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার সকালের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৪ দশমিক ৫৭ ডলার বা ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়ে ৭৮ দশমিক ৭৩ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৪ দশমিক ২৩ ডলার বা ৬ দশমিক ০১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৬৭ ডলারে। দুই ধরনের তেলের দাম গত ২২ জুনের পর সর্বোচ্চে পৌঁছেছে।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অপরিশোধিত তেল বিক্রির অনুমোদন দেওয়া সাধারণ লাইসেন্স বাতিল করার পর মঙ্গলবারও উভয় ধরনের তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছিল।
বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সংঘাত মেটাতে ইরানের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, তা এখন ‘অতীত’। তেহরানের সঙ্গে তিনি আর কোনো আলোচনায় জড়াতে চান না বলেও জানিয়েছেন।
গত মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা চুক্তি সই হয়েছিল; যার উদ্দেশ্য ছিল আলোচনার জন্য ৬০ দিনের নির্ধারিত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া। তবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বিমান হামলা চালানোর পর চুক্তিটি ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্যাক্সো ব্যাংকের বিশ্লেষক ওলে হ্যানসেন বলেন, ‘‘বাণিজ্যিক জাহাজে নতুন করে হামলা অথবা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি ঘটনায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে; বাজার এখন আবারও সেই ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে।’’
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলার জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী বিমান হামলা চালিয়েছে। এর পরপরই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বুধবার ভোরের দিকে বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়।
এসব হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমএসটি মারকুয়ের প্রধান সাউক কাভোনিভ বলেন, ‘‘সমঝোতা স্মারক শেষ হয়ে গেছে বলে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের পর দু’পক্ষের উত্তেজনা নতুন করে মোড় নিয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’’
জাহাজ ট্র্যাকিংয়ের তথ্যে দেখা গেছে, সাগরে জাহাজের ওপর নতুন করে হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়ে গেছে। যে কারণে অন্তত চারটি তেল ও গ্যাস ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা ত্যাগ করে ফিরে গেছে।
বিশ্লেষক ওলে হ্যানসেন বলেন, ‘‘তেল সরবরাহের মূল সংকট কিন্তু দূর হয়নি। বরং সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে তা আরও বাধাগ্রস্ত হলো।’’
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই করার পর তেলের দাম কমে যুদ্ধপূর্ববর্তী স্তরে নেমে এসেছিল। সে সময় দাম আরও কমবে ধরে নিয়ে ব্যবসায়ীরা তেলের ভবিষ্যৎ বাজারে বড় ধরনের দাম কমার পক্ষে বাজি তৈরি করেছিলেন।
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাজারে তেলের ঘাটতি মেটাতে তাদের জরুরি মজুত থেকে তেল ব্যবহার করে আসছিল। নরডিক আর্থিক গ্রুপ এসইবির প্রধান পণ্য বিশ্লেষক বিয়ার্নে শিলড্রপ বলেন, ‘‘আমার মনে হয়, বাজারের বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে তেলের দাম ৭০ ডলার থেকে ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলারের কাছাকাছি থাকাটাই বেশি যৌক্তিক।’’
এদিকে, একাধিক বাণিজ্য সূত্র বুধবার বলেছে, চীন চলতি জুলাইয়ের বাকি সময়ের জন্য পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানির ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে। একই সঙ্গে চার মাস বন্ধ থাকার পর একটি বেসরকারি শোধনাগারকে পুনরায় জ্বালানি রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরান যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনাগারটি আবারও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.