গাজায় ‘গণহত্যার’ এক হাজার দিন, নিহত ৭৩ হাজার ৯৮ জন

azaফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর এক হাজার দিন পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে গাজার ৯০ শতাংশেরও বেশি এলাকা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৯৮ জনে।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও সহিংসতা থামেনি। ৬ জুলাই পর্যন্ত সময়ে উপত্যকাটিতে অন্তত এক হাজার ৭২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গত সপ্তাহেও গাজাজুড়ে হামলা অব্যাহত ছিল। ১ জুলাই আল-হিলু স্টেশনের কাছে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হন। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় আরও অন্তত সাতজন নিহত হন, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। খান ইউনিসের কাছে ১০ বছর বয়সী তারেক সাবাহ নিহত হওয়ার ঘটনাও স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া আল-মাওয়াসি মানবিক অঞ্চলে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়স্থল তাঁবুতেও একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।

চিকিৎসা সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির মধ্যে গাজার আল-শিফা হাসপাতালের সামনে আহত ও অসুস্থ রোগীরা চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০ হাজারের বেশি রোগী রাফাহ সীমান্ত দিয়ে বের হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

এদিকে, গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক ডা. হুসাম আবু সাফিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার ছেলে ইলিয়াস আবু সাফিয়া। ৫৫৫ দিনের বেশি সময় ধরে তিনি ইসরায়েলের কারাগারে আটক রয়েছেন।

ইলিয়াস বলেন, “আমার বাবার আইনজীবী সম্প্রতি দেখা করে জানিয়েছেন, তিনি শ্বাস নিতে ও কথা বলতে কষ্ট পাচ্ছেন। নির্যাতন ও শারীরিক কষ্টের চিহ্ন তার মুখমণ্ডলে স্পষ্ট।”

জাতিসংঘের নির্বিচার আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ ডা. আবু সাফিয়ার অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেছে এবং তার আটককে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।

এদিকে গাজার প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সাইপ্রাসের আয়িয়া নাপায় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রতিনিধিরা, যার মধ্যে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও রয়েছেন, হামাসমুক্ত অঞ্চলগুলো পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক করেছেন।

সোমবার হামাস পরিচালিত গাজা সরকার তাদের পদত্যাগ এবং ক্ষমতা একটি প্রযুক্তিনির্ভর কমিটির কাছে হস্তান্তরের ঘোষণা দেয়। তবে বাস্তবে এখনো ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি।

গাজা প্রশাসনের জাতীয় কমিটির প্রধান আলী শাথ বলেছেন, প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও উপকরণ নিশ্চিত করা হলে তার কমিটি দায়িত্ব গ্রহণে প্রস্তুত। তবে তিনি একক আইন ও একক কর্তৃত্বের অধীনে প্রশাসন পরিচালনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন, যা মূলত হামাসের নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অন্যদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েল নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। গত ৩ জুলাই ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা মধ্য পশ্চিম তীরের বিনইয়ামিন অঞ্চলে ১৩টি নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে।

এছাড়া জেরুজালেমের উত্তরাঞ্চলের সাবেক কালান্দিয়া বিমানবন্দরের স্থানে নতুন একটি ইসরায়েলি ‘হেরিটেজ সেন্টার’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

ফিলিস্তিনি গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নতুন অবৈধ বসতি নির্মাণের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৩২টি, ২০২৪ সালে ৬২টি এবং ২০২৫ সালে ৮৬টি নতুন আউটপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাও বেড়েছে। নাবলুস, রামাল্লাহ ও মাসাফের ইয়াত্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, গবাদিপশু চুরি এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় সংস্থা (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, ২০২৬ সালেই পশ্চিম তীরে দুই হাজার ৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের মধ্যে এক হাজারেরও বেশি শিশু।

গাজায় যুদ্ধের এক হাজার দিন পূর্তির এই সময়ে অঞ্চলটি শুধু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়নি, বরং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মানবিক বিপর্যয় এবং ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.