প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পরীক্ষায় নকল করার ধরন। এক সময় সহপাঠীর খাতা দেখে বা হাতে ছোট নোট লিখে নকল করা হতো। এখন সেই জায়গা দখল করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত স্মার্ট চশমা।
বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার পরীক্ষাকেন্দ্রিক সমাজগুলোতে, যেখানে একটি পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীের ভবিষ্যৎ শিক্ষা, চাকরি ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেখানে নতুন এই প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সম্প্রতি সাউথ কোরিয়াতে ইংরেজি দক্ষতা মূল্যায়নের একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই পরীক্ষার্থী এআই স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে নকল করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। ওই পরীক্ষার ফলাফল দেশটিতে চাকরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়।
অন্যদিকে তাইওয়ানে একটি শীর্ষ মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থীকে স্মার্ট চশমা পরে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেখা যায়। পরীক্ষার সময় তার অস্বাভাবিক আচরণ এবং চশমার ফ্রেম থেকে তাপ বের হওয়া দেখে কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। পরে তদন্তে নকলের বিষয়টি ধরা পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে নকলের ঘটনা নতুন নয়। তবে এআই-সমৃদ্ধ পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি এখন আরও সস্তা, উন্নত এবং সহজলভ্য হয়ে ওঠায় শিক্ষাব্যবস্থা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এ কারণে বিভিন্ন দেশ পরীক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। চলতি মাসে চীনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এক কোটিরও বেশি পরীক্ষার্থীর চশমা পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একইভাবে যুক্তরাজ্যের পরীক্ষাবিষয়ক নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানও সতর্ক করে বলেছেন, এআই চশমা এবং স্মার্ট ইয়ারপিস পরীক্ষায় নকলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশাসন জানিয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এআই চশমার মাধ্যমে নকল ঠেকাতে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে পরীক্ষার হলে সব ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মতো এআই চশমাও নিষিদ্ধ।
এদিকে হংকং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মেং জিলি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত এআই চশমা দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পরীক্ষার ওপর গবেষণা চালান। সেখানে দেখা যায়, পরীক্ষার প্রশ্নের দিকে তাকালেই চশমাটি প্রশ্নগুলো এআই ভাষা মডেলে পাঠিয়ে উত্তর তৈরি করতে পারে এবং সেই উত্তর লেন্সে প্রদর্শন করে।
গবেষণায় পাওয়া ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। এআই চশমার মাধ্যমে পাওয়া নম্বর ১০০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর একটি শ্রেণিতে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে স্থান করে নেয় এবং গড় নম্বর ৭২-এর চেয়েও বেশি ছিল।
গবেষণাটির সহ-নেতা অধ্যাপক ঝ্যাং জুন বলেন, প্রযুক্তি ও এআই এত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে যে শিক্ষাব্যবস্থা এর সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, শিক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিকে কীভাবে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়।
অন্যদিকে এডুকেশন ইউনিভার্সিটি অফ হংকং -এর অধ্যাপক কং সিউ চেউ Siu Cheung মনে করেন, এআইয়ের ক্ষমতা যতই বাড়ুক না কেন, প্রযুক্তির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা উচিত নয়। বরং শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণী সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে তারা এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে।
তার ভাষায়, ‘প্রযুক্তি ব্যবহার করতেই হবে, এআইও ব্যবহার করতে হবে। তবে নিজের চিন্তাশক্তিকে কখনোই প্রযুক্তির কাছে সমর্পণ করা যাবে না।’



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.